Categories
Blog

বিচারক VS রাসুলগণ

 

বিচার দিবসের মাঠে বিচারক Vs রাসুলগণ

সাধারণভাবে আমরা বহুদিন ধরে একটি ধারণা শুনে ও জেনে এসেছি—কিয়ামতের ময়দানে রাসূল মুহাম্মদ সা; তাঁর উম্মতের জন্য সুপারিশ করতে থাকবেন, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর উম্মতের সবাইকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কুরআন কি সত্যিই এমন কোনো চিত্র আমাদের সামনে উপস্থাপন করে?

আসুন, প্রচলিত ধারণাকে কিছুক্ষণের জন্য পাশে রেখে সরাসরি কুরআনের আয়াতগুলোর দিকে তাকাই। কোনো পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত নয়; বরং আয়াত গুলোকে পাশাপাশি রেখে দেখি—বিচার দিবসে রাসূলদের ভূমিকা সম্পর্কে কুরআন কী বার্তা দেয়। বিচার দিবসে রাসুলকে আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন তাঁর সম্প্রদায় তাঁকে এবং তাঁর বক্তব্যকে কীভাবে গ্রহণ করেছিল। জবাবে তিনি বলবেনঃ “যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম, ততদিন আমি তাদের ওপর সাক্ষী ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে গ্রহণ করলেন, তখন আপনিই তাদের ওপর পর্যবেক্ষক ছিলেন। আর আপনি সবকিছুর ওপর সাক্ষী।” (৫:১১৭) এখানে দুটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

প্রথমত, “আমি তাদের ওপর সাক্ষী ছিলাম।” অর্থাৎ তিনি যতদিন তাঁদের মধ্যে ছিলেন, ততদিন তাঁদের কার্যকলাপের সাক্ষী ছিলেন।

দ্বিতীয়ত, তাঁর চলে যাওয়ার পর তিনি বলবেনঃ “তখন আপনিই তাদের ওপর পর্যবেক্ষক ছিলেন।”

অর্থাৎ আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী, রাসূলের প্রত্যক্ষ উপস্থিতির পর মানুষের ওপর আল্লাহর পর্যবেক্ষণই অব্যাহত থাকে। রাসুল আরো বলবেনঃ “আপনি আমাকে যা আদেশ করেছিলেন, আমি তাদেরকে তা ছাড়া আর কিছু বলিনি।” তারপর তিনি আরো বলছেন:“আল্লাহর ইবাদত করো—যিনি আমার রব এবং তোমাদের রব।” (৫:১১৭)

রাসুল নিজের জন্য কোনো স্বাধীন ক্ষমতা বা বিচারিক কর্তৃত্বের দাবি করছেন না; বরং তিনি তাঁর দায়িত্বকে আল্লাহর দেওয়া বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করছেন।  বিচার দিবসে ঈসা (আ.) এভাবেই বলবেন কোরান বার্তা দেয়।

এবার দেখি বিচার দিবসে মুহাম্মদ সাঃ এর বিষয়ে কোরান কি বার্তা জানায়ঃ প্রথমেই মুহাম্মদ সাঃ এর ক্ষেত্রে কুরআনের একটি কঠিন সতর্কবার্তাঃ– “বলুন, আমি রাসূলদের মধ্যে নতুন কোনো অভিনব ব্যক্তি নই। #আর আমি জানি না আমার সঙ্গে কী করা হবে এবং তোমাদের সঙ্গেই বা কী করা হবে। আমি তো কেবল আমার প্রতি যা ওহি করা হয় তারই অনুসরণ করি; আর আমি তো কেবল একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী।”(৪৬:৯)

এখানে দুটি শব্দগুচ্ছ বিশেষভাবে চিন্তার দাবি রাখে— “আমি জানি না।” এবং— “আমার সঙ্গে কী করা হবে এবং তোমাদের সঙ্গে কী করা হবে।”

অর্থাৎ রাসূল নিজেই ঘোষণা করছেন যে তাঁর ও তাঁর সম্প্রদায়ের পরিণতি সম্পর্কে তিনি নিজস্ব জ্ঞান থেকে কিছু জানেন না; তিনি কেবল তাঁর প্রতি যে ওহি করা হয় তার অনুসরণ করেন। এ বক্তব্যের সঙ্গে কুরআনের আরেকটি আয়াত মিলিয়ে দেখা যায়— “বলুন, আল্লাহ যা চান তা ছাড়া আমি নিজের কোনো উপকার বা অপকারের ক্ষমতা রাখি না। আর আমি যদি অদৃশ্য জানতাম, তাহলে অনেক কল্যাণ অর্জন করতাম এবং কোনো অকল্যাণ আমাকে স্পর্শ করত না। আমি তো কেবল সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা।” (৭:১৮৮)

এই আয়াতগুলো রাসূলের নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা তুলে ধরে—তিনি নিজস্বভাবে অদৃশ্যের জ্ঞান বা নিজের জন্য উপকার-অপকারের স্বাধীন ক্ষমতার দাবি করেননি।

শুধু মুহাম্মদ সাঃ নন— সকল রাসূলকে একত্র করে তাঁদের প্রশ্ন করা হবেঃ— “আর যেদিন আল্লাহ রাসূলদের একত্র করবেন, অতঃপর বলবেন, ‘তোমাদের কী জবাব দেওয়া হয়েছিল?’ তারা বলবে, ‘আমাদের কোনো জ্ঞান নেই; নিশ্চয়ই আপনিই অদৃশ্য সমূহের সর্বজ্ঞ।’ (৫:১০৯) এখানে প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— “তোমাদের কী জবাব দেওয়া হয়েছিল?” অর্থাৎ তাঁদের সম্প্রদায় তাঁদের আহ্বানের কী জবাব দিয়েছিল—সে বিষয়ে তাঁদের প্রশ্ন করা হবে। কিন্তু তাঁদের উত্তর হবে সেদিনঃ  “আমাদের কোনো জ্ঞান নেই।” এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞানের স্বীকৃতি দিবেন এ বলে যে, “নিশ্চয়ই আপনিই অদৃশ্যসমূহের সর্বজ্ঞ।”

মুহাম্মদ সাঃ কে বিচার দিবসে  বরং সাক্ষী হিসাবে দাড় করবেন মর্মে কোরান বার্তা জানায়ঃ “তখন কী হবে, যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী আনব এবং তোমাকেও এদের ওপর সাক্ষী হিসেবে আনব?” (সূরা আন-নিসা ৪:৪১) অনুরুপ সূরা নাহলেও ৮৯ আয়াত ঘোষণা দেয়ঃ “আর সেদিন, যখন আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্য থেকে তাদের ওপর তাদেরই একজন সাক্ষী দাঁড় করাব এবং তোমাকেও এদের ওপর সাক্ষী হিসেবে আনব…”

দুটি আয়াতেই একটি শব্দ বারবার সামনে আসে—সাক্ষী। অর্থাৎ কুরআনের ভাষায় বিচার দিবসে রাসূলের একটি সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত ভূমিকা হলো—সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হওয়া।

এবার এমন একটি আয়াতের দিকে আসা যাক, যা এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্যকে  আরও গভীর করে তোলে। কুরআনে রাসূলের একটি বক্তব্য এভাবে এসেছে— “আর রাসূল বলবে, ‘হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমার সম্প্রদায় এই কুরআনকে পরিত্যক্ত করে নিয়েছিল।’” (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৩০)

এখানে লক্ষ করার বিষয় হলো—এই আয়াতে রাসূল তাঁর সম্প্রদায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন—এমন কথা বলা হয়নি। বরং তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে  একটি অভিযোগ  তাঁর রবের কাছে তুলে ধরেছেন এ বলে —

“তারা এই কুরআনকে পরিত্যক্ত করে নিয়েছিল।” অতএব, এই আয়াতকে বিচার দিবসে রাসূলের অভিযোগ বা নালিশসদৃশ বক্তব্য হিসেবে বোঝা যায়—যদিও “অভিযোগ” শব্দটি আয়াতের আক্ষরিক শব্দ নয়; এটি আয়াতের বক্তব্য থেকে নেওয়া একটি ব্যাখ্যা মূলক অভিব্যক্তি।

তাহলে সুপারিশের প্রচলিত ধারণাটি কোথায় দাঁড়ায়? এখানেই আমাদের থামতে হবে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করতে হবে। কুরআনে শাফা‘আত (شَفَاعَة) শব্দ এবং সুপারিশের বিষয় অবশ্যই এসেছে। কিন্তু কুরআন সুপারিশকে মানুষের নিজস্ব স্বাধীন ক্ষমতা হিসেবে উপস্থাপন করে না। বরং বারবার জানায়—সুপারিশের কর্তৃত্ব আল্লাহর এবং তাঁর অনুমতি ছাড়া কোনো সুপারিশ কার্যকর নয়।

সুতরাং “রাসূল সাঃ তাঁর উম্মতের জন্য সুপারিশ করতে থাকবেন এবং শেষ পর্যন্ত সবাইকে ক্ষমা করিয়ে দেবেন”—এই নির্দিষ্ট দাবিটি কুরআনের উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে সরাসরি প্রত্যাখিত হয়। বরং কুরআনের আয়াতগুলো পাশাপাশি রাখলে আমরা দেখতে পাই— রাসূল নিজেই বলেন, “আমি জানি না আমার সঙ্গে কী করা হবে এবং তোমাদের সঙ্গেই বা কী করা হবে।” (৪৬:৯)

ক) তিনি বলেন,“আমি নিজের কোনো উপকার বা অপকারের ক্ষমতা রাখি না—আল্লাহ যা চান তা ছাড়া।”(৭:১৮৮)

খ) রাসূলদের একত্র করে প্রশ্ন করা হবে—“তোমাদের কী জবাব দেওয়া হয়েছিল?” ৫:১০৯

গ) রাসূলদের একজনকে একজনকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করা হবে।

ঘ) মুহাম্মদ সাঃ -কে বলা হবে—“তোমাকেও এদের ওপর সাক্ষী হিসেবে আনব।” (৪:৪১; ১৬:৮৯)

ঙ) আর কুরআনে এমন একটি দৃশ্যও রয়েছে যেখানে রাসূল অভিযোগ করবেনঃ “হে আমার রব! আমার সম্প্রদায় এই কুরআনকে পরিত্যক্ত করে নিয়েছিল।”(২৫:৩০)

সবশেষে বলব কুরআনের আয়াতগুলোকে একত্রে পড়লে বিচার দিবসে রাসূলদের ভূমিকা সম্পর্কে একটি গভীর ও চিন্তা জাগানিয়া চিত্র পাওয়া যায়।

রাসূলগণ ছিলেন বার্তাবাহক, সতর্ককারী এবং সাক্ষী। তাঁরা মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছেন, ওহি পৌঁছে দিয়েছেন এবং তাঁদের সম্প্রদায়ের সামনে সত্যকে স্পষ্ট করেছেন।

কিন্তু মানুষের চূড়ান্ত বিচার, অন্তরের গোপন বিষয়, অদৃশ্যের পূর্ণ জ্ঞান এবং ক্ষমা প্রদানের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব—এসবের মালিক আল্লাহ।

বিশেষ করে ৪৬:৯-এর “وَمَا أَدْرِي — আমি জানি না”, ৭:১৮৮-এর “আমি নিজের কোনো উপকার বা অপকারের ক্ষমতা রাখি না”, ৫:১০৯-এর “আমাদের কোনো জ্ঞান নেই”, এবং ৪:৪১ ও ১৬:৮৯-এর “সাক্ষী”—এই শব্দগুলো আমাদের প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে কুরআনের আলোকে পরীক্ষা করার সুযোগ দেয়।

আর (২৫:৩০) আয়তটি কোরানের  পাঠকের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন রেখে যায়: যাঁর কাছে আমরা সুপারিশের আশ্বাস খুঁজি, সেই রাসূলই যদি বিচার দিবসে বলেন—

“হে আমার রব! আমার সম্প্রদায় এই কুরআনকে পরিত্যক্ত করে নিয়েছিল।”

তাহলে আমাদের প্রত্যেকের নিজের কাছে প্রশ্ন করা উচিত, আমরা কি সত্যিই সেই কুরআনকে আঁকড়ে ধরেছি, যার ভিত্তিতে কিয়ামতের দিন আমাদের বিচার হবে?

হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রাসূল আমাদের জন্য করবেন কি না—তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো:

কুরআন আজ আমাদের কাছে কী দাবি করছে, এবং আমরা তার জবাব কী দিচ্ছি?

কারণ কুরআনের ভাষায় শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দাঁড়ায়— “তোমাদের কী জবাব দেওয়া হয়েছিল?” ৫:১০৯

এই প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেক মানুষকেই নিজের জীবন দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে।

By Ekramul hoq

I am A.K.M Ekramul hoq MA.LLB. Rtd Bank Manager & PO of Agrani Bank Ltd. I am interested writing and reading. Lives in Bangladesh, District Jamalpur.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

``` }