আল্লাহর উপর দোষ চাপানো কর্মফল ও তকদীরের দর্শন
মানুষ জন্মায় ভিন্ন ভিন্ন নিয়তি নিয়ে— কেউ দেখে আলোর পৃথিবী, কেউ জন্মমুহূর্তেই অন্ধকারে বন্দী; কেউ সুস্থ দেহ নিয়ে হাঁটে, আবার কেউ জন্মগত পঙ্গুত্বের ভার বয়ে বেড়ায়। কেউ পূর্ণ আয়ু পায়, কেউ আবার শিশুকালেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়।
বজ্রপাত, ভূমিকম্প, সুনামি, টাইফুন—প্রাকৃতিক প্রতিটি দুর্যোগ কোনো না কোনো নিষ্পাপ শিশুর প্রাণকে কেড়ে নেয়।
তখন প্রশ্ন জাগে—এই বৈষম্যের উৎস কোথায়?
এই নৈর্ব্যক্তিক বেদনার পিছনে কি শুধুই অন্ধ ভাগ্যের খেলা? না কি স্রষ্টা নিজে পক্ষপাতিতার কোনো গোপন রেখা টেনে রেখেছেন?
কিন্তু এই প্রশ্নটি উঠেই ভেঙে যায়। কারণ স্রষ্টাকে আমরা চিনি আদল নামে— যিনি মহা-ন্যায়বিচারক, পক্ষপাতহীন, সুষম মহাজগতের স্থপতি।
কেউ কেউ বিস্ময় প্রকাশ করে— “কোরআনকে আল্লাহ হেফাজত করেন, অথচ তাঁর ঘর কাবা একসময় মূর্তিপূজার আশ্রয় হয়ে ছিল—এ কথায় কি আল্লাহ দুর্বল মনে হয় না?”
দর্শনের দৃষ্টিতে এ প্রশ্ন ভুল নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ। কারণ ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনা মাত্র দুই বলের সংঘাতে ঘটে— স্বাধীন ইচ্ছা এবং সার্বিক নিয়ম।
কাবায় মূর্তি ছিল—এটি আল্লাহর দুর্বলতা নয়; মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার চূড়ান্ত ব্যবহার। আল্লাহ যদি প্রতিটি মন্দকে অগ্রিম নিষিদ্ধ করে দিতেন, তবে ন্যায়বিচারের সমস্ত মানদণ্ড ভেঙে পড়ত। তখন মানুষ মানুষ থাকত না— একটি নির্ধারিত যান্ত্রিক সত্তায় পরিণত হতো।
কোরআন বলে— “যা কিছু মঙ্গল তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যা কিছু অমঙ্গল তা তোমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে।” (৪:৭৯)
এই আয়াত দুনিয়ার ঘটনাপুঞ্জের দর্শন ব্যাখ্যা করে—
আল্লাহ সম্ভাবনার দরজা খুলে দেন,
আর মানুষ তার মধ্য থেকে নির্বাচন করে।
অমঙ্গলের দায় তাই মানুষের; এটি আল্লাহর উপর চাপানো ন্যায়বিচারের অস্বীকারের শামিল।
মানুষের নফস পৃথিবীর সাথে সংঘাতে পড়ে— বস্তুজগত, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, অহং, লোভ—সব মিলে কলবকে ঢেকে ফেলে। চিত্তের আয়নায় জমে যায় ধূলি। অন্তরের দরজা ভারী হয়ে পড়ে, আর আলোক-দর্শনের ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়।
এই আচ্ছন্ন অবস্থা মানুষকে মহাজাগতিক সত্য উপলব্ধি করতে দেয় না। তাকে মনে হয়—”যা ঘটছে সবই আল্লাহর ইচ্ছায় আরোপিত”। কিন্তু বাস্তবে— মানুষ নিজের গড়া পরিণামের পথেই হাঁটে।
স্বাধীন ইচ্ছা—মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বোঝুক সম্পদ।
দর্শন বলে— যেখানে স্বাধীনতা নেই, সেখানে নীতি, ন্যায়, পুরস্কার, শাস্তি—কোনো ধারণা অর্থপূর্ণ থাকে না।
আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন সীমিত কিন্তু অর্থবহ স্বাধীন ইচ্ছা। এই ইচ্ছাশক্তিই মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
এর সঠিক ব্যবহার—আত্মার উত্তরণ, জান্নাতের দিকে উত্থান।
এর অপব্যবহার আত্মার অবনতি, জাহান্নামের দিকে পতন।
স্রষ্টা এখানে নিরপেক্ষ— তিনি পথ দেখান, পথ চাপিয়ে দেন না।
পথভ্রষ্টতা—আল্লাহ বাধ্য করেন না,ফল পাওয়া
সুরা মুমিন (৪০:৩৩) বলে— “আল্লাহ যাকে পথহীন অবস্থায় রাখেন, তার কোনো পথ প্রদর্শক নেই।”
এটিও এক গভীর দর্শন—
আল্লাহ কাউকে ইচ্ছা করে অন্ধকারে ফেলেন না। মানুষ যখন নিজেকে আলো থেকে সরিয়ে নেয়, তখন আল্লাহ তার স্বাধীন ইচ্ছাকে সম্মান করেন— এটিই “পথহীন অবস্থায় থাকা”।
এ এক প্রাকৃতিক নিয়ম, যেমন অন্ধ চোখে সূর্য দেখা যায় না— সূর্য অন্ধ করে না, চোখই সূর্য হারায়।
সবশেষে বলবোঃ মানুষের জন্মগত অক্ষমতা, অকাল মৃত্যু, কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়— এসব আল্লাহর অন্যায় নয়; বরং মহাবিশ্বের জটিল নিয়ম, মানব-ইচ্ছা, বস্তুজগতের সম্পর্ক, এবং মানবসত্তার অভ্যন্তরীণ সংগ্রামের ফল।
আল্লাহ ন্যায় বিচারক, ভারসাম্যের রক্ষক। মানুষ স্বাধীন ইচ্ছার পথে হাঁটে, আর সেই পথই তার ভাগ্যকে আকৃতি দেয়।
