Categories
Blog

আচার অনুষ্ঠান

 

মানুষ কি সত্যিই রব/ঈশ্বরের নির্দেশ মেনে চলার জন্য ধর্মীয় আচার পালন করে, নাকি অনেক সময় আচারকেই মুক্তির শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করে?

যখন মানুষ মনে করতে শুরু করে যে নির্দিষ্ট কোনো অনুষ্ঠান, পবিত্র স্থান, পবিত্র বস্তু, মন্ত্র, দান বা ধর্মীয় ব্যক্তির মধ্যস্থতার মাধ্যমে তার পাপ মুছে যাবে—তখন ধর্মের নৈতিক শিক্ষা ধীরে ধীরে আচারনির্ভর হয়ে উঠতে পারে।

আর এই জায়গাতেই জন্ম নিতে পারে একটি ধর্মীয় অর্থনীতি—যেখানে মানুষের ভয়, অপরাধবোধ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ শ্রেণি ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করে।

একদিকে কৃষ্ণের জন্মকে কেন্দ্র করে জন্মাষ্টমী পালিত হয়।

অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের কিছু সম্প্রদায় নবী মুহাম্মদের জন্মস্মরণে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করে।

“দুই ধর্মীয় সংস্কৃতিতে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের জন্মস্মরণকে কেন্দ্র করে উৎসব/অনুষ্ঠানের সমান্তরালতা দেখা যায়।”

মহাভারতে কুন্তীকে দুর্বাসা ঋষির কাছ থেকে একটি মন্ত্র পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি দেবতাকে আহ্বান করতে পারেন। কুন্তী সূর্যদেবকে আহ্বান করেন এবং কর্ণের জন্ম হয়।

অন্যদিকে কোরআনে মরিয়মের ক্ষেত্রে বলা হয়,কোনো পুরুষ তাকে স্পর্শ করেনি; ফেরেশতা তাকে একটি পবিত্র পুত্রের সংবাদ দেন এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তে ঈসার গর্ভধারণ ঘটে।

যদিও দুই আখ্যানের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি এক নয়।

ইসলামি ঐতিহ্যে জমজম একটি পবিত্র জলাধার এবং হজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অন্যদিকে গঙ্গা হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে পবিত্র নদী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিভিন্ন সভ্যতায় জলকে শুদ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করার একটি সাধারণ মানবিক প্রবণতা রয়েছে।

ইসলামি সমাজের কিছু অঞ্চলে মৃত্যুর পর তৃতীয়, সপ্তম, চল্লিশতম দিন ইত্যাদিতে সামাজিক/ধর্মীয় অনুষ্ঠান করার প্রচলন রয়েছে।

একইভাবে হিন্দু সমাজের বিভিন্ন অঞ্চলে মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ ও অন্যান্য আচার পালনের ভিন্ন ভিন্ন রীতি রয়েছে।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের কিছু আখ্যান-পরম্পরায় রাধার উৎপত্তিকে কৃষ্ণের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত করা হয়েছে।

ইসলামি জনপ্রিয় ধর্মীয় বর্ণনায় হাওয়াকে আদমের পাঁজর থেকে সৃষ্ট বলা হয়।

একদিকে কৃষ্ণের জন্মকে কেন্দ্র করে জন্মাষ্টমী পালিত হয়।

অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের কিছু সম্প্রদায় নবী মুহাম্মদের জন্মস্মরণে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করে।

“দুই ধর্মীয় সংস্কৃতিতে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের জন্মস্মরণকে কেন্দ্র করে উৎসব/অনুষ্ঠানের সমান্তরালতা দেখা যায়।”

ইসলামি হাদিস-ঐতিহ্যে কাল পাথরকে জান্নাত থেকে আগত পাথর বলা হয়েছে।

হিন্দু ঐতিহ্যে শিবলিঙ্গ ও বিভিন্ন পবিত্র শিলা/শালগ্রামকে কেন্দ্র করে উপাসনা ও তীর্থসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতিতে জপমালা ব্যবহৃত হয়। মুসলিম সমাজে তাসবিহ ব্যবহৃত হয়।

শালগ্রাম শিলা নেপালের গণ্ডকী নদী অঞ্চলের সঙ্গে বৈষ্ণব ঐতিহ্যে যুক্ত।

অন্যদিকে নীল নদ মিসরের সভ্যতার কেন্দ্র।

দুই ধর্মীয় সংস্কৃতিতেই এমন স্থাপনা রয়েছে

মসজিদ → সালাত/জিকির/সমাবেশ মন্দির → পূজা/উপাসনা/সমাবেশ মসজিদে মুসলমানদের সালাতের জন্য আজানের মাধ্যমে আহ্বান করা হয়।

হিন্দু মন্দিরে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘণ্টা, শঙ্খ ও অন্যান্য শব্দের মাধ্যমে পূজার সূচনা বা ধর্মীয় পরিবেশ তৈরি করা হয়।

কুরবানীতে “আল্লাহর কাছে তাদের গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না; বরং তোমাদের তাকওয়া তাঁর কাছে পৌঁছে।

বলি দানেও অনুরুপ বিশ্বাস পোষন করে।

হজ, তীর্থ, গঙ্গাস্নান, পবিত্র স্থান দর্শন—বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্কৃতিতে এগুলোর সঙ্গে শুদ্ধতা, পুণ্য বা আধ্যাত্মিক কল্যাণের ধারণা যুক্ত হয়েছে।

মানুষ কি নৈতিক পরিবর্তনের পরিবর্তে একটি আচারকে নিজের পাপমোচনের মাধ্যম বানিয়ে ফেলছে?

যদি কেউ অন্যায় করে, তারপর কোনো নির্দিষ্ট আচার পালন করে মনে করে—“এখন আমার পাপ শেষ।”

কোরবানির সময় চুল ও নখ না কাটার বিধান মুসলিম সমাজে হাদিসভিত্তিক একটি নির্দিষ্ট আমল হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে বিভিন্ন হিন্দু ধর্মীয় উৎসব ও পূজার আগে চুল-নখ সংক্রান্ত আচার বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়।

যেমন “শ্যামাপূজার আগের তিন দিন সর্বত্র নখ-চুল কাটা নিষিদ্ধ”—

তাই এই উদাহরণটি “আচারগত সাদৃশ্যের দাবি” হিসেবে রাখা যেতে পারে, কিন্তু নিশ্চিত ঐতিহাসিক সমান্তরাল হিসেবে নয়।

ইসলামি লোকবিশ্বাসে মক্কা-মদিনায় মৃত্যু নিয়ে বিশেষ মর্যাদার ধারণা রয়েছে।

হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে কাশী, বৃন্দাবনসহ বিভিন্ন তীর্থস্থানে মৃত্যুর বিশেষ আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের ধারণা রয়েছে।

হজের ইহরামের ক্ষেত্রে পুরুষ মুসলিমের জন্য নির্দিষ্ট পোশাকের বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে হিন্দু তীর্থসংস্কৃতিতে সেলাইবিহীন বা গেরুয়া পোশাকের ব্যবহার বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়।

পবিত্র যাত্রায় সাধারণ দৈনন্দিন পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদা থেকে নিজেকে আলাদা করার জন্য বিশেষ পোশাক বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্কৃতিতে ব্যবহৃত হয়েছে।

তীর্থযাত্রার সঙ্গে মাথা মুণ্ডনের রীতি ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারায় রয়েছে।

হজের ক্ষেত্রেও পুরুষ হাজির মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করার বিধান রয়েছে।

হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতিতে একাদশী উপবাস একটি পরিচিত ধর্মীয় অনুশীলন।

ইসলামে সিয়াম/রোজা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।

“সব ধর্মের মানুষের জন্য একটি আয়না—আমরা কি রবের নির্দেশ পালন করছি, নাকি ধর্মীয় আচারকে ব্যবহার করে নিজের অপরাধবোধ থেকে মুক্তির একটি সহজ পথ খুঁজছি?”

আর এখানেই “ধর্মের ব্যবসা” প্রসঙ্গটি আসে।

ধর্মীয় শিক্ষক, পুরোহিত, মোল্লা, পাদ্রি—কেউই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধর্মব্যবসায়ী নন। কিন্তু যখন কোনো ধর্মীয় কর্তৃত্ব মানুষের ভয়, পাপবোধ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে অর্থ, ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত প্রভাব অর্জনের উপায়ে পরিণত করে, তখন ধর্মের নৈতিক শিক্ষা একটি প্রতিষ্ঠিত “মুক্তির বাজারে” পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

“ধর্মের সত্যতা শুধু তার আচার দিয়ে যাচাই করা যায় না; বরং দেখতে হবে সেই আচার মানুষকে কী বানাচ্ছে—আরও ন্যায়বান, সত্যবাদী, সংযমী ও মানবিক মানুষ, নাকি শুধু পাপ করে আবার একটি অনুষ্ঠান করে নিজেকে মুক্ত মনে করা মানুষ?”

By Ekramul hoq

I am A.K.M Ekramul hoq MA.LLB. Rtd Bank Manager & PO of Agrani Bank Ltd. I am interested writing and reading. Lives in Bangladesh, District Jamalpur.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

``` }