ধর্মের আচার- অনুষ্ঠানঃ
মানুষ কি স্রষ্টার নির্দেশ অনুসরণের জন্য ইবাদত করে?
নাকি পাপের ভয়, শাস্তি থেকে মুক্তি লাভের আশায় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে?
এই প্রশ্নকে সামনে রেখে ইসলাম ও সনাতন ধর্মের কিছু প্রচলিত বিশ্বাস ও আচার পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ করলে কি সমীকরন দাড়ায়?
১) ইসলামি ঐতিহ্যে কোরআনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ বোঝার ক্ষেত্রে হাদিসের দ্বারস্থ হতে দেখা যায়।
অন্যদিকে সনাতন ধর্মের প্রাচীন বৈদিক ধর্ম গ্রন্থের বিভিন্ন ব্যাখ্যা জানতে মহাকাব্য, পুরাণ এর স্মরনাপন্ন হতে হয়।
#অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রেই মূল ধর্মীয় ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা ও আচার-অনুষ্ঠানের বিকাশ ঘটেছে।
২) মহাভারতীয় কাহিনি অনুযায়ী, কুমারী কুন্তী মন্ত্রের মাধ্যমে সূর্যদেবকে আহ্বান করেন এবং সূর্যের কৃপায় কর্ণের জন্ম হয়।
অন্যদিকে কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, মরিয়মের কোনো পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই আল্লাহর কুদরতে ঈসা (আ.)-এর জন্ম হয়।
এখানে উভয় ঐতিহ্যেই মানবীয় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে অলৌকিক জন্মের ধারণা লক্ষ করা যায়—যদিও তাদের ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
৩) ইসলামি ঐতিহ্যে জমজমের পানি পবিত্র উৎস হিসেবে বিবেচিত এবং মুসলিমদের কাছে তা বরকতময়।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে গঙ্গাজল পবিত্র বলে বিবেচিত এবং তীর্থ ও পাপমোচনের ধারণা গভীরভাবে যুক্ত।
দুই ঐতিহ্যেই একটি নির্দিষ্ট জলধারাকে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে দেখা যায়।
৪) মৃত্যুর পর মুসলিম চল্লিশা আয়োজনের প্রচলন রয়েছে।
সনাতন ধর্মীয় সমাজেও মৃত্যুর পর আত্মার শান্তি ও পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ আচার পালনের প্রচলন রয়েছে।
অতএব এখানে মূল বিষয় হলো—মৃত্যুর পরবর্তী আত্মিক অবস্থার সঙ্গে মানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় আচারকে যুক্ত করার প্রবণতা।
৫) শ্রীকৃষ্ণের বামপার্শ্ব হতে সৃষ্টি “রাধা” , যার সুন্দর নিতম্ব ও পীন-পায়োধর। [ ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ ]
আদমের বাম পাঁজর থেকে বিবি হাওয়ার সৃষ্টি ইসলাম ধর্মের দাবী।
৬) জন্মাষ্টমি সনাতন ধর্মে শ্রী কৃষ্নের জন্মদিন পালিত করে। অন্য দিকে ঈদে মিলাদুনবী পালন করে নবী মুহাম্মদ সাঃ প্রতি ভক্তি জানায় ইসলাম ধর্মের অনুসারী।
৭) কাল পাথর একটি জান্নাতী পাথর মুসলমান ধর্মের বিশ্বাস। শিব পাথর একটি স্বর্গীয় পাথর সনাতন ধর্মে বিশ্বাস।
৮) দেবতার নাম গননার জন্য জপমালার ব্যবহার হিন্দু ধর্ম অনুসারী। আল্লাহর পবিত্রতা গননার জন্য তাসবির ব্যবহার করে মুসলিম।
৯) ভগবান বিষ্ণুর শালগ্রাম শিলা বা নারায়ন শিলার উৎপত্তি নোপালের গন্ডকী নদের ইতিহাস থেকে ।
অপর দিকে মিশরের নীল নদের ইতিহাস মুসা: ফেরাঊনের ইতিহাস থেকে।
১০) আল্লার নাম নেয়ার জন্য আল্লার ঘর মসজিদ নির্মান করে ইসলাম ধর্ম অনুসারী ।
সনাতন ধর্মের ভগবানের পুজো দেয়ার জন্য মন্দির নির্মান করে হিন্দু ধর্মের অনুসারী।
১১) আল্লার ঘরে আসার জন্য আযানের মাধ্যমে আহ্বান করা হয়। সনাতন ধর্মে মন্দিরে আসার জন্য শাখ শংখ বাঁজিয়ে ডাকা হয়।
১২) কোরবানীর পশুর গোশত আল্লাহর জন্য নয় শুধু তার নামে কোরবানীই তার সন্তুষ্টি।
সনাতন ধর্মে ভগবান পশুর রক্ত মাংশ খান না শুধু তার নামে বলি দিলেই খুশি হন।
১৩) হজ্জ ব্রত পালন করে কাল পাথর চুমো খেলে পাপ মুক্ত মুসলমানের বিশ্বাস।
সনাতন ধর্ম মতে গঙ্গা জলে স্নান করলে ধরাধামে পাপ মুক্ত হয়।
১১) কোরবানীর আগের তিনদিন নখ,চুল দুপায়া প্রাণী জবেহ নিষিদ্ধ। সনাতন ধর্মে শ্যাম পুজোর আগের তিনদিন নখ,চুল কাটা নিষিদ্ধ।
১২) মক্কা মদীনার মাটিতে মৃত্যু হলে জান্নাতী বলে বিশ্বাস ইসলাম ধর্ম মতে।
সনাতন ধর্মে বিশ্বাস বৃন্দাবন-কাশীতে মৃত্যু হলে স্বর্গবাসী।
১৩) হজ্জের পোষাক সাদা ও সেলাই বিহীন আবশ্যক সনাতন ধর্মে গয়া-কাশিতে পোষাক গেরুয়া ও সেলাই বিহীন।
১৪) তীর্থে গেলে মাথা কামায়, হজে গেলও মাথা কামায়।
১৫) সনাতন ধর্মে একাদশী ব্রত, উপবাস ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিশিযাপনের প্রচলন রয়েছে।
ইসলামে সিয়াম বা রোজার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় খাদ্য-পানীয় থেকে বিরত থাকার বিধান রয়েছে।
উপরের তুলনাগুলো থেকে একটি প্রশ্ন সামনে আসে:—-
যখন মানুষ স্রষ্টার নির্দেশের পরিবর্তে শুধুমাত্র আচার-অনুষ্ঠানকে মুক্তির নিশ্চয়তা হিসেবে গ্রহণ করে, তখন ধর্মের আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য অনেক সময় বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে চলে যায়।
ফলে মানুষ নিজের পাপ, ভয়, অপরাধবোধ কিংবা পরকালের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির জন্য কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিকে অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন ধর্মীয় কর্তৃত্বের সঙ্গে ব্যবসা, ক্ষমতা ও সামাজিক প্রভাবের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দেয়।
প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীকে আঘাত করার জন্য নয়। বরং প্রশ্নটি আরও মৌলিক
মানুষ কি স্রষ্টার আনুগত্যের জন্য ইবাদত করে, নাকি ইবাদতকে নিজের পাপমুক্তির একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে?
