দুই জীবন, দুই মৃত্যু—তাহলে প্রথম জীবন কোথায়?
কুরআন একটি গভীর প্রশ্ন আমাদের সামনে রেখে যায়— “দুই জীবন” এবং “দুই মৃত্যু”—এই কথার অর্থ কী?
“হে আমাদের রব! আপনি আমাদের দু’বার মৃত্যু দিয়েছেন এবং দু’বার জীবন দিয়েছেন।” (সূরা গাফির ৪০:১১)
যদি প্রতিটি মানুষের জীবনে সত্যিই দুই মৃত্যু ও দুই জীবন থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে— প্রশ্নঃ পৃথিবীর এই বর্তমান জীবনের আগে সেই অন্য জীবনটি কখন ছিল?
প্রশ্নঃ-১ সেই জীবনের স্থান কোথায় ছিল?
প্রশ্নঃ -২ আর সেই জীবনের পর প্রথম মৃত্যু কখন এবং কোথায় ঘটেছিল?
এই প্রশ্নের অনুসন্ধানে আমাদের যেতে হয় সূরা আল-আ‘রাফের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াতের কাছে।
“আমি কি তোমাদের রব নই?”
“আর যখন তোমার রব আদম-সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে তাদের সাক্ষী করলেন—‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’”(৭:১৭২)
এখানেই শুরু হয় আমাদের অনুসন্ধান। আয়াতটি শুধু কোনো সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার কথা বলছে না; এখানে একটি প্রশ্ন, উত্তর এবং সাক্ষ্য রয়েছে।
আল্লাহ প্রশ্ন করছেন: আলাস্তু বিরব্বিকুম? “আমি কি তোমাদের রব নই?”
আর তারা উত্তর দিচ্ছে: কালূ বালা শাহিদনা “তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’
এখন প্রশ্ন— এই অঙ্গীকার গ্রহণের ঘটনাটি কোথায় ঘটেছিল?
কুরআন কি সেই স্থানটির নাম বলেছে? না।
৭:১৭২ আয়াতটি ঘটনার কথা বলেছে, কিন্তু সেই স্থান বা জগতের নাম নির্দিষ্ট করে বলেনি।
২) “পৃষ্ঠদেশ” বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আয়াতের প্রথম অংশ: মিন যুহূরিহিম যুররিয়্যাতাহুম অর্থ: “তাদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের..
এখানে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ: ظُهُورِهِمْ —যুহূরিহিম অর্থ: পিঠ, পৃষ্ঠদেশ।
অতএব প্রশ্ন ওঠে— এখানে “পৃষ্ঠদেশ” বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে?
কেউ যদি বলেন, এখানে মানুষের পৃষ্ঠদেশ থেকে ভবিষ্যৎ বংশধরদের বোঝানো হয়েছে এবং সেটিকে পুরুষের বীর্য বা শুক্রাণুর সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে নতুন একটি প্রশ্ন সামনে আসে।
৩) বীর্য যদি হয়—তাহলে সাক্ষ্য দিল কে? বীর্যের মধ্যে মানবজীবনের জৈবিক উপাদান থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—
নফস কোথায়? রূহ কোথায়? সচেতনতা কোথায়? বাকশক্তি কোথায়?
কারণ আয়াতটি শুধু “সৃষ্টি”র কথা বলছে না। আয়াত বলছে—
ওয়া আশহাদাহুম ‘আলা আনফুসিহিম “তিনি তাদের নিজেদের সম্পর্কে তাদের সাক্ষী করলেন।”
তারপর প্রশ্ন করেছেন: “আমি কি তোমাদের রব নই?”
তারপর উত্তর: “তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’
এখানে আয়াতের ক্রমটি লক্ষ্য করুন: ذُرِّيَّة → أَشْهَدَهُمْ → أَنفُسِهِمْ → قَالُوا → بَلَىٰ → شَهِدْنَا
অর্থাৎ: বংশধর > তাদের সাক্ষী করা > তাদের নফস > তারা বলল > হ্যাঁ > আমরা সাক্ষ্য দিলাম।
এখানে যদি শুধু জৈবিক শুক্রাণুকে এই বক্তব্যের বক্তা হিসেবে ধরা হয়, তাহলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত প্রশ্ন তৈরি হয়।কারণ — قَالُوا — কালূ = “তারা বলল” بَلَىٰ — বালা = “হ্যাঁ” شَهِدْنَا — শাহিদনা = “আমরা সাক্ষ্য দিলাম”
এগুলো একটি সাক্ষ্যদানকারী সত্তার বক্তব্য হিসেবে এসেছে।
৪) তাহলে কি এটি রূহদের কোনো পূর্ব জগতের সভা?
এখানে আমাকে একটি সম্ভাব্য প্রশ্নের কাছে নিয়ে যায়ঃ এটি কি এমন কোনো পূর্ব-অস্তিত্বের পর্যায়, যেখানে আদম-সন্তানদের নফসসমূহকে সাক্ষ্যদানে উপস্থিত করা হয়েছিল?
অবশ্য আমরা নিশ্চিত বলতে পারি না “এটি অবশ্যই রূহদের কোনো নির্দিষ্ট জগতের সভা ছিল।”
কারণ কুরআন ৭:১৭২-এ رُوح — রূহ শব্দটি ব্যবহার করেনি। বরং ব্যবহার করেছে:
أَنْفُسِهِمْ — আনফুসিহিম। অর্থাৎ: তাদের নফসসমূহ / তাদের নিজেদের সত্তা।
তাই এখানে “রূহ”কে সরাসরি বসিয়ে দেওয়া কুরআনের শব্দের প্রতি অতিরিক্ত ব্যাখ্যা হয়ে যাবে।
৫) “পৃষ্ঠদেশ” আর “গর্ভ”—দুটি কি একই? এখানে কুরআনের শব্দচয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের গর্ভধারণের স্থান বোঝাতে কুরআন বলেছে:
ফী বুতূনি উম্মাহাতিকুম “তোমাদের মায়েদের গর্ভে।”(৩৯:৬)
আবার ভ্রূণের অবস্থান সম্পর্কে: ফী কারারিন মাকীন “এক নিরাপদ/সুরক্ষিত স্থানে।”(২৩:১৩)
অর্থাৎ কুরআন যখন গর্ভের কথা বলে, তখন بُطُون — বুতূন শব্দ ব্যবহার করে।
আর ৭:১৭২-এ ব্যবহার করেছে: ظُهُور — যুহূর। অর্থাৎ পৃষ্ঠদেশ।
তাই ظُهُور = গর্ভ অথবা ظُهُور = বীর্য—এমন সরাসরি সমীকরণ কুরআনের শব্দচয়ন থেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না।
৬) তাহলে “ظُهُورِهِمْ” কী নির্দেশ করছে? এখানেই গবেষণার জায়গা।
যুহূরিহিম (ظُهُورِهِمْ)-কে সরাসরি “বীর্য” অনুবাদ করা আরবি শব্দটির আক্ষরিক অর্থ নয়।
আর যদি বলা হয়—“এখানে পুরুষের বীর্য বোঝানো হয়েছে এবং সেই বীর্য থেকেই পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর মানুষ এসেছে।তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়: সেই বীর্য কীভাবে বলল—“হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম”?
এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ আয়াতের মাঝখানে স্পষ্টভাবে আছে:
عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ “তাদের নিজেদের/নফসের ব্যাপারে।”
অর্থাৎ আয়াতের ভাষা শুধু জৈবিক বস্তু নয়, নফস ও সাক্ষ্যদানকারী সত্তার কথাও সামনে নিয়ে আসে।
৭) আর এখানেই ২:২৮ নতুন প্রশ্ন তৈরি করে আল্লাহ বলেন: “তোমরা প্রাণহীন ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের জীবন দিয়েছেন; তারপর তিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন; তারপর তিনি তোমাদের জীবন দেবেন; তারপর তাঁর কাছেই তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে।(২:২৮)
এখানে একটি ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়: أَمْوَاتًا → أَحْيَاكُمْ → يُمِيتُكُمْ → يُحْيِيكُمْ
অর্থাৎ: প্রাণহীন অবস্থা > জীবন > মৃত্যু > জীবন।
আর ৪০:১১-এ একই বিষয় সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়েছে:
“আপনি আমাদের দু’বার মৃত্যু দিয়েছেন এবং দু’বার জীবন দিয়েছেন।”
তাহলে প্রশ্নটি আরও গভীর হয়— ২:২৮-এর প্রথম জীবনটি কি পৃথিবীর বর্তমান জীবন?
যদি তাই হয়— তার আগে যে “প্রাণহীন” অবস্থা ছিল, সেটি কী?
আর যদি ৪০:১১-এর দুই জীবন ও দুই মৃত্যুকে পূর্ণ জীবনচক্র হিসেবে ধরা হয়— পৃথিবীর বর্তমান জীবনের আগে সেই অন্য জীবনটি কোথায় ছিল?
৮) ৭:১৭২ ও ২:২৮-কে পাশাপাশি রাখলে
একদিকে: ৭:১৭২ নফস > সাক্ষ্য > “হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।”
অন্যদিকে:২:২৮ প্রাণহীন > জীবন > মৃত্যু > জীবন।
আর _ ৪০:১১ দাবী করে মৃত্যু × ২ ➡️ জীবন × ২।
তখন একটি গবেষণামূলক প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই তৈরি হয়: সাক্ষ্যদানের সেই অবস্থানটি কি দুই জীবনের কোনো একটি জীবন ছিল?
নাকি— সাক্ষ্যদানের ঘটনাটি জীবন-মৃত্যুর হিসাবের বাইরের কোনো বিশেষ পর্যায়?
কুরআন সরাসরি কি বলেছে? এখানে এখনো চূড়ান্ত উত্তর নেই।
৯) কুরআন এমন পুনঃপুন পৃথিবী জন্মের চক্র সরাসরি ঘোষণা করে না। তবে —
“পৃথিবীর বর্তমান জীবনের পূর্বে আদম-সন্তানের কোনো এক পূর্ববর্তী অস্তিত্ব বা অবস্থার ইঙ্গিত কি ৭:১৭২-এ রয়েছে?” এই প্রশ্নটি খোলা রাখা যায়।
সুতরাং এখনো সবচেয়ে বড় গবেষণার প্রশ্নটি রয়ে যায়: “আমি কি তোমাদের রব নই?”—এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় আমরা কোন অবস্থায় ছিলাম?
সেই অবস্থার আগে আমাদের কী অবস্থা ছিল?
আর ৪০:১১-এর ‘প্রথম মৃত্যু’ ঠিক কোথায় এবং কখন ঘটেছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ৭:১৭২ নয়—২:২৮, ৩:১৮৫, ৩৯:৪২, ৪০:১১, ৪৪:৫৬, ৩৭:৫৯ এবং সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোকে একটি ধারাবাহিক কাঠামোয় বসিয়ে পড়তে হবে।
সিদ্ধান্ত এখনই নয়—আগে সব আয়াতকে কথা বলতে দেওয়া হোক। পরবর্তি পর্বে….
