إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ
ইন্নাহু লা-কাওলু রাসূলিন কারীম। (৬৯:৪০)
“নিশ্চয়ই এটি একজন সম্মানিত রাসূলের বাণী।”
১) إِنَّهُ = নিশ্চয়ই এটি ২) لَ = অবশ্যই / নিশ্চয় (জোর প্রদানের জন্য) ৩) قَوْلُ = বাণী, উক্তি ৪) رَسُولٍ = একজন রাসূলের ৫) كَرِيمٍ = সম্মানিত
“নিশ্চয়ই এটি একজন সম্মানিত রাসূলের বাণী।”
৬৯:৪০ আয়াতের আক্ষরিক অনুবাদটি কি ভুল? যদি সঠিক হয় তাহলে কোরান রাসুলের বাণী বুঝায় এটিও মেনে নেয়া যায় না। এর সমাধান কি? কোরান থেকে দেখবো।
১) إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ (৬৯:৪০) ইন্নাহু লা-কাওলু রাসূলিন কারীম। “নিশ্চয়ই এটি একজন সম্মানিত রাসূলের বাণী।”
আয়াতটির ভেতরে “রাসূলের মাধ্যমে আনীত” বা “আল্লাহর পক্ষ থেকে” বা রাসুল বলতে এখানে ফিরেস্তাকে বুঝিয়েছে —এ ধরনের কোনো শব্দ নেই।
সেই অর্থটি যারা করেন, তারা সাধারণত একই প্রসঙ্গের পরবর্তী আয়াত (৬৯:৪৩) এবং পুরো সূরার ধারাবাহিকতা বিবেচনা করে করেন।
তাই সব আয়াতের সরল অনুবাদ দিয়ে কোরান বুঝতে গেলে বিপরীত হতে পারে। কিছু আয়াতের আক্ষরিক অনুবাদ যাহাই থাকুক ব্যাকারনের সাহায্য নিয়ে সমগ্র কোরানে শব্দটি আর কোন কোন আয়াতে আছে তার বিচার বিশ্লেষন করে অনুবাদ নির্ধারন করতে হয়। যেমনঃ ৬৯:৪০ আয়াতের
إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ
ইন্নাহু লা-েকাওলু রাসূলিন কারীম।
এর আক্ষরিক অনুবাদ কোরান রাসুলের বানী বুঝালেও এ আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট ৬৯:৪৩ নং আয়াত ভ্রম দুর করে প্রতিষ্ঠিত করে কোরআন আল্লাহর বাণী।
অতএব, ৬৯:৪০ আয়াতটির ভেতরে “রাসূলের মাধ্যমে আনীত” বা “আল্লাহর পক্ষ থেকে”—এ ধরনের কোনো শব্দ নেই।
সেই অর্থটি যারা করেন, তারা সাধারণত একই প্রসঙ্গের পরবর্তী আয়াত (৬৯:৪৩) এবং পুরো সূরার ধারাবাহিকতা বিবেচনা করে করেন।
তবে একই প্রসঙ্গে, পরের আয়াতে বলা হয়েছে: تَنزِيلٌ مِّن رَّبِّ الْعَالَمِينَ (৬৯:৪৩)
“এটি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।” এখানে مِن (থেকে/পক্ষ থেকে) শব্দটি স্পষ্টভাবে আছে।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে কোরান স্ববিস্তারিত ব্যাখ্যায়িত নিজেই ঘোষনা দেয়ে। সেখানে ফেরাস্তা কতৃক বহন বা আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষনা এসব উক্তি যোগ করা মানে নিজের মনের স্বপক্ষে যুক্তি দাড় করানো।
আর আয়াত যখন পুর্ণ এবং সুষ্পষ্ট তখন পরের আয়াতের সাহায্য নিয়ে বুঝতে হবে কেন?
উত্তর হ্যা কোরান স্ববিস্তারিত ব্যাখ্যায়িত নিজেই ঘোষনা দেয়ে। যেমনঃ ১৬:৮৯ — “وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ” — “আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি, যা সব কিছুর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা।”
তাহলে অন্য আয়াতের সাহায্য নিতে হবে কেন?
নিশ্চয়ই এটি একজন সম্মানিত রাসূলের বাণী।” এখানে “আল্লাহর পক্ষ থেকে”, “বহন করে এনেছেন”, “পৌঁছে দিয়েছেন”—এসব শব্দ এই আয়াতে নেই। তাই নিজের মত করে যুক্ত করাও ঠিক হবে না।
তবে এটিও মনে রাখা দরকার যে, কোনো অনুবাদে অতিরিক্ত শব্দ যোগ করা এবং কুরআনের অন্য আয়াতের আলোকে একটি আয়াত ব্যাখ্যা করা—এই দুটি বিষয় এক নয়।
এছাড়া আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার। কুরআন নিজেই বহু স্থানে এক বিষয়কে বিভিন্ন আয়াতে ব্যাখ্যা করে। যেমন:
কোনো আয়াতে সংক্ষিপ্ত নির্দেশ, অন্য আয়াতে সেই বিষয়ের বিস্তৃত বর্ণনা।
যেমনঃ “নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের কাছে যেও না”
সূরা আন-নিসা (৪):৪৩ এ আয়াতটির পুর্ন মর্ম প্রকাশ করে যখন আয়াতের পরের অংশ যুক্ত করা হয়। আর এটিকে ব্যাকারনের ভাষায় ইদফা বলে।
ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আমানূ, লা তাকরাবুস্-সালাতা ওয়া আন্তুম সুকারা, —- “হাত্তা তা’লামূ মা তাকূলূন…”
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের কাছে যেও না, যতক্ষণ না বুঝতে পারো তোমরা কী বলছ…”
আয়াতে (৪:৪৩) নেশাগ্রস্ত/ মোহগ্রস্থ অবস্থায় “সালাতের কাছে না যাওয়ার” নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরের অংশে ক্লিয়ার করে দিয়েছে তার কারন – যতক্ষন না বুঝতে পার তোমরা কি বলিতেছ।
এবার আবারো প্রশ্ন আসতে পারে, পরের আয়াত যদি স্বব্যাখায়িত পুর্বের আয়াতের কথা বুঝায় তবে কি পুর্বের আয়াত মানসুখ হয়েছে? না হয়ে থাকলে অহেতুক কোরানে ডবল আয়াত দিতে হবে কেন?
না মানসুখ হয়নি। তবে এখানেও দুটি বিষয় আলাদা রাখা দরকার।
একটি পরের আয়াত পূর্বের আয়াতকে বাতিল করে—এটি এক বিষয়। আর একটি পরের আয়াত একই বিষয় সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য দেয়—এটি আরেক বিষয়।
উদাহরণস্বরূপ, কুরআনে অনেক ঘটনাই ধারাবাহিক কয়েকটি আয়াতে এসেছে, যেখানে প্রথম আয়াত একটি বক্তব্য দেয়, পরবর্তী আয়াত সেই প্রসঙ্গকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এর অর্থ এই নয় যে প্রথম আয়াতটি অসম্পূর্ণ ছিল; বরং পুরো অনুচ্ছেদ (passage) মিলিয়ে একটি বক্তব্য গঠিত হয়েছে।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কুরআনে قَوْل (কওল), رَسُول (রাসূল) এবং এ ধরনের বাক্যগঠনের অন্যান্য ব্যবহার একত্রে বিশ্লেষণ করতে হবে। সেটি একটি ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা।
অতএব, আমি বলব না যে ৬৯:৪০ “মানসুখ” এবং ৬৯:৪৩ এসে তা “সংশোধন” করেছে।
আবার এটাও বলব না যে ৬৯:৪০-এর অনুবাদে আয়াতে অনুপস্থিত শব্দ যোগ করাই সঠিক। আমার দৃষ্টিতে এই দুটি দাবি পৃথক, এবং একটিকে প্রতিষ্ঠা করতে অন্যটি অপরিহার্য নয়।
আমার গবেষণা পদ্ধতি যেহেতু কুরআনের শব্দকে কুরআন দিয়েই বোঝা, তাহলে পরবর্তী চিন্তা হতে পারে “قَوْل” (কওল) শব্দটি কুরআনে যেখানে যেখানে এসেছে, সেখানে এটি কি সর্বদা বক্তার নিজস্ব রচনা বোঝায়, নাকি কখনও কেবল বক্তার মুখে উচ্চারিত বক্তব্যও বোঝায়—সেটি পদ্ধতিগতভাবে পরীক্ষা করা। সেই বিশ্লেষণই এই প্রশ্নের ভাষাগত ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করবে।
১) ق و ل এটি একটি ত্রিবর্ণমূল (ثلاثي مجرد) ধাতু। যার অর্থ কথা বলা, উক্তি করা, প্রকাশ করা, ঘোষণা করা। কুরআনে এ রূপটি বহুবার এসেছে। যেমনঃ
১) قَالَ (ক্বালা) – সে বলল ২) يَقُولُ,, (ইয়াকূলু) -সে বলে / বলে থাকে ৩) قُلْ (কুল) – বল (আদেশ) ৪) قُلْتُ (কুলতু) – আমি বলেছি ৫) قَالُوا (ক্বালূ) – তারা বলল ৬) قِيلَ (ক্বীলা) – বলা হলো
যামানা বা কালের উপর ভিত্তি করে কুরআনে ق و ل ধাতুর অনেক রূপ এসেছে। যেমন—
ক) অতীত কাল قَالَ – সে বলল খ) قَالُوا – তারা বলল গ) قَالَتْ সে (নারী) বলল
এই ৬৯:৪০ আয়াতে إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ
১) إِنَّهُ = নিশ্চয়ই এটি ২) لَ = অবশ্যই ৩) قَوْلُ = বাণী / বক্তব্য ৪) رَسُولٍ = একজন রাসূলের ৫) كَرِيمٍ = সম্মানিত
এখানে قَوْلُ ও رَسُولٍ একটি ইদাফা (إضافة) গঠন করেছে তাই মর্ম বুঝার জন্য পরের আয়াত আবশ্যক ।
পরের আয়াত ৬৯:৪১-৪৩ এ বলতেছেনঃ
এটি কোনো কবির বাণী নয়।” (৬৯:৪১)
“এটি কোনো গণকের (কাহিনের) বাণীও নয়।” (৬৯:৪২) এটি শয়তানের বাণী নয়।
বরং ইতিবাচকভাবে বলেছে قول رسول كريم
“এটি একজন সম্মানিত রাসূলের বাণী।”
বলেই ইদাফা করে পরবর্তি আয়াত ৬৯:৪৩ তে পুর্নাঙ্গ ভাব ব্যাক্ত করেন, ইহা
“বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছ থেকে নাযিলকরণ।
تَنزِيلٌ مِّن رَّبِّ الْعَالَمِينَ
আক্ষরিক অর্থ: “বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছ থেকে নাযিলকরণ।”
এখানে ” مِّن (থেকে) শব্দটি স্পষ্টভাবে আছে। তাই ৬৯:৪০ আয়াতের উচ্চারণকারী রাসূল, কিন্তু আদেশদাতা আল্লাহ। বুঝায় বলে আক্ষরিক অর্ঘ “ইহা সন্মানিত রাসুলের বানী ” প্রকাচ করলেও ব্যাকারনগত বিশ্লেষনে ইদাফা হয়ে অর্থ দ্বারায়ঃ
নিশ্চয়ই এই কুরআন এক সম্মানিত রাসূলের বহনকৃত বার্তা।
