কুরআনের যে সকল শব্দ সমূহের বিকৃত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে তার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘আনুগত্য’ ( يُطِعِ )।
وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ فَأُو۟لَٰٓئِكَ مَعَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمَ ٱللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ ٱلنَّبِيِّۦنَ وَٱلصِّدِّيقِينَ وَٱلشُّهَدَآءِ وَٱلصَّٰلِحِينَۚ وَحَسُنَ أُو۟لَٰٓئِكَ رَفِيقًا
যারা আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করবে তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ভাজন নবী, সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের সঙ্গী হবে। আর সঙ্গী হিসেবে তারাই উত্তম।( ৪:৬৯)
* এখানে আল্লাহর আনুগত্য বলতে কুরআন কে বুঝানো হয়েছে আর রাসূলের আনুগত্য বলতে বার্তা বাহকের বার্তার আনুগত্য কে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ উভয় ক্ষেত্রে কুরআন কে বুঝানো হয়েছে। وَ অব্যয়টি দিয়ে একই বিষয়কে দুই ভিন্ন রূপে বুঝাতে ব্যবহার হয়েছে। وَ অব্যয়টি যে একই বিষয়কে দুই ভিন্ন রূপে বুঝাতে ব্যবহার হয় তার প্রমানে নিচের আয়াত দুইটি লক্ষ্য করুন।
يَٰٓأَهْلَ ٱلْكِتَٰبِ قَدْ جَآءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنتُمْ تُخْفُونَ مِنَ ٱلْكِتَٰبِ وَيَعْفُوا۟ عَن كَثِيرٍۚ قَدْ جَآءَكُم مِّنَ ٱللَّهِ نُورٌ وَكِتَٰبٌ مُّبِينٌ
হে কিতাবীগণ, তোমাদের নিকট আমার রাসূল এসেছে, কিতাব থেকে যা তোমরা গোপন করতে, তার অনেক কিছু তোমাদের নিকট সে প্রকাশ করছে এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিয়েছে। অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে।
(৫:১৫) يَهْدِى بِهِ ٱللَّهُ مَنِ ٱتَّبَعَ رِضْوَٰنَهُۥ سُبُلَ ٱلسَّلَٰمِ وَيُخْرِجُهُم مِّنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ بِإِذْنِهِۦ وَيَهْدِيهِمْ إِلَىٰ صِرَٰطٍ مُّسْتَقِيمٍ
‘এর’ দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন, তাদেরকে নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে স্বীয় নির্দেশ দ্বারা অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে আনয়ন করেন এবং সরল পথে পরিচালনা করেন।(আল-মা’য়েদা ৫:১৬)
দেখুন (نُورٌ وَّكِتَابٌ مُبِين ৫:১৫) এই আয়াতে আল্লাহ্ ‘নূর ও কিতা-বুম মুবীন’ (জ্যোতি ও সুস্পষ্ট গ্রন্থ) একই সাথে উল্লেখ করেছেন এবং এই দুইয়েরই উদ্দেশ্য হচ্ছে কুরআন। কেননা এই দুইয়ের মধ্যে وَ সংযোজক অব্যয়টি পাশাপাশি দুই বিশেষ্যের ভিন্নতা বুঝাতে ব্যবহূত হয়নি; বরং ভিন্ন রূপে একই বিষয়কে বুঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এই অব্যয়টি আসলে একই বিষয়ের দুই ভিন্ন রূপের সংযোজক অব্যয়।
যার স্পষ্ট প্রমাণ কুরআনের পরবর্তী (৫:১৬) আয়াত, যেখানে বলা হচ্ছে يَهدِي بِهِ الله অর্থাৎ এর দ্বারা আল্লাহ হিদায়াত করেন বা সুপথ দেখান। যদি نور ও كتاب আলাদা আলাদা জিনিস হত, তাহলে কুরআনের এই বাক্যটি এইরূপ হত, يَهدِي بِهِمَا الله অর্থাৎ, সর্বনামটি একবচন না হয়ে দ্বিবচন হত (ه) একবচন না হয়ে هما দ্বিবচন হত এবং অনুবাদ ‘এর’ দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন’ না হয়ে ‘উভয়’ দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন’ হত। কুরআনের এই বাক্য থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমানিত হলো যে, ‘নূর’ ও ‘কিতা-বুম মুবীন’ উভয় শব্দের উদ্দেশ্য ‘কুরআন’।
وَ অব্যয়টি একই বিষয়কে বুঝানোর দুই ভিন্ন রূপের সংযোজন অব্যয় হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। আর ‘নূর’ বলতে যে কুরআনকে বুঝানো হয়েছে, তার প্রমাণে সূরা তাগাবুনের ৮ নাম্বার আয়াতটি দেখুন।
فَـَٔامِنُوا۟ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱلنُّورِ ٱلَّذِىٓ أَنزَلْنَاۚ وَٱللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
অতএব তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এবং আমি যে নূর অবতীর্ণ করেছি তার প্রতি ঈমান আন। আর তোমরা যে আমল করছ আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।( ৬৪:৮)
অনুরূপ ভাবে আসুন আমরা এবার গভীর ভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করি সূরা নূরের ৫৪ নাম্বার আয়াতটি। আয়াতের শুরুতে বলা হয়েছে “আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রসূলের আনুগত্য কর” আয়াতের পরের অংশে تُطِيعُو শব্দের পরে এক বচনে অব্যয় হিসাবে এসেছে هُ।
এতে প্রমান হয় আল্লাহ ও রাসূল সত্তাগত ভিন্ন কিন্তু আনুগত্যের ক্ষেত্রে অভিন্ন। এই জন্যই এখানে একবচনের অব্যয় هُ ব্যবহার করা হয়েছে। আর সেই অভিন্ন বিষয়টি হচ্ছে আল্লাহর নাজিলকৃত কিতাবের আনুগত্য করা। যারা এই আনুগত্যের বিষয়টির মধ্যে পার্থক্য করে তারাই কুফরীতে লিপ্ত।
قُلْ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَۖ فَإِن تَوَلَّوْا۟ فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُم مَّا حُمِّلْتُمْۖ وَإِن تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا۟ۚ وَمَا عَلَى ٱلرَّسُولِ إِلَّا ٱلْبَلَٰغُ ٱلْمُبِينُ
বলুনঃ আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার উপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্যে সে দায়ী এবং তোমাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্যে তোমরা দায়ী। তোমরা যদি তাঁর আনুগত্য কর, তবে সৎ পথ পাবে। রসূলের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টরূপে পৌছে দেয়া। (২৪:৫৪)
إِنَّ ٱلَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُوا۟ بَيْنَ ٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُوا۟ بَيْنَ ذَٰلِكَ سَبِيلًا
নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের সাথে কুফরী করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে পার্থক্য করতে চায় এবং বলে, ‘আমরা কতককে বিশ্বাস করি আর কতকের সাথে কুফরী করি’ এবং তারা এর মাঝামাঝি একটি পথ গ্রহণ করতে চায়।(আন-নিসা ৪:১৫০)
সারকথাঃ আল্লাহর আনুগত্য করা এবং রাসুলের আনুগত্য করার অর্থ আল্লাহর আনুগত্য বলতে যেমন কোরানের আনুগত্য। রাসুলের আনুগত্য মানে আল্লাহর কিতাবের আনুগত্য।
—— বর্তমান সমাজে মানুষের ধর্মীয় আবেগ নিয়ে কোরআনের আলোকে কিছু উপস্থাপন করতে চাচ্ছি।
কখনও কখনও মানুষ সত্য শুনতে চায় না কারণ তারা তাদের বিভ্রান্তিগুলি ধ্বংস করতে চায় না।”
ধর্মীয় বিষয়ে মানুষ জন্মগত ভাবে যে বিষয়টি সত্য জেনে আসছে তা অন্য কেউ মিথ্যা বললে সহজে মেনে নিতে পারে না।
মানুষ ধর্মীয় বিষয়ে তার জানা গুলো ডাহা মিথ্যা হলেও তার জানা গুলোকেই একমাত্র সত্য মনে করে এবং বাকি সব মিথ্যা মনে করে।
একজন ব্যক্তি যখন হঠাৎ জানতে পারে তার ধর্মীয় বিষয়ে জানা গুলো অনেক কিছুই মিথ্যা তখন সে উত্তেজিত হয়। সে মেনে নিতে পারে না। যুগে যুগে এ সংঘর্ষ সকল নবী রাসুলদের সাথেও হয়ে আসছে।
যখন তাহাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ্ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তাহা তোমরা অনুসরণ কর’, তাহারা বলে, ‘না, বরং আমরা আমাদের পিতৃ পুরুষদেরকে যাহাতে পাইয়াছি তাহার অনুসরণ করিব।’ এমন কি, তাহাদের পিতৃ পুরুষগণ যদিও কিছুই বুঝিত না এবং তাহারা সৎপথেও পরিচালিত ছিল না-। সুরা বাকারা আয়াত একশত সত্তুর।
দীর্ঘ দিনের পালিত অভ্যাস, বাপদাদার যে ভাবে এবাদত করতে দেখে আসতেছে, অধিকাংশ লোকেকে যে ভাবে ধর্ম কার্যাদি সম্পাদন করতে দেখে আসতেছে তা থেকে সড়ে এসে যত সত্য কথার উপস্থাপন করা হোক না কেন, মানুষ তা গ্রহন করতে রাজি না, যদিও কোরান থেকে দৃষ্টান্ত দেয়া হয়। আর এমন হবে তা আল্লাহ জানেন বলেই নবী ও তার পরবর্তি অনুসারীদের লক্ষ্য করে আল্লাহ বলেনঃ
যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল তবে তাহারা তোমাকে আল্লাহ্র পথ হইতে বিচ্যুত করিবে। তাহারা তো শুধু অনুমানের অনুসরণ করে ; আর তাহারা শুধু অনুমান ভিত্তিক কথা বলে। সুরা আনাম আয়াত নং ১১৬
মানুষের মধ্যে কেহ কেহ আল্লাহ্ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে; তাহাদের না আছে জ্ঞান, না আছে পথ নির্দেশ, না আছে কোন দীপ্তিমান কিতাব। সুরা হজ্জ আয়াত নং ৮
বরং সে বিতণ্ডা করে ঘাড় বাঁকাইয়া লোকদেরকে আল্লাহ্র পথ হইতে ভ্রষ্ট করিবার জন্য। তাহার জন্য লাঞ্ছনা আছে ইহলোকে এবং কিয়ামত দিবসে আমি তাহাকে আস্বাদ করাইব দহন – যন্ত্রণা। সুরা হজ্জ আয়াত ৯
আল্লাহ এমন দৃষ্টিত সুরা ইমরানের ১০৫ নং আয়াতে বলেনঃ
তোমরা তাহাদের মত হইও না যাহারা তাহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আসিবার পর বিচ্ছিন্ন হইয়াছে ও নিজেদের মধ্যে মতান্তর সৃষ্টি করিয়াছে। তাহাদের জন্য মহাশাস্তি রহিয়াছে।
এ বিষয়ে আল্লাহ সুরা মুমিনিন ২৩,আয়াত নং ৫৩ উপদেশ দিয়ে বলেনঃ
فَتَقَطَّعُوْۤا اَمْرَهُمْ بَيْنَهُمْ زُبُرًا ؕ كُلُّ حِزْبٍۢ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُوْنَ
কিন্তু তাহারা নিজেদের মধ্যে তাহাদের দীনকে বহু দলে বিভক্ত করিয়াছে। প্রত্যেক দলই তাহাদের নিকট যাহা আছে তাহা লইয়া আনন্দিত।
আরেক ধাপ এগিয়ে আল্লাহ বলেনঃ বরং মানুষের মধ্যে কতক অজ্ঞানতা বশত আল্লাহ্ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে এবং অনুসরণ করে প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের। সুরা হজ্জ আয়াত নং ৩ ।
আল্লাহ্ ইচ্ছা করেন তোমাদের নিকট বিশদ ভাবে বিবৃত করিতে, তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতি তোমাদেরকে অবহিত করিতে এবং তোমাদের ক্ষমা করিতে। (সূরা নেসা ২৬)
অধিকাংশ ঈমান এনে এবাদত করছে ঠিকই কিন্তু উল্টো পথে এবং তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে ভাবছে আমরা অনেক ভাল আমল করছি। প্রকৃত সব পন্ডুসার। এ বিষয়ে আল্লাহ সুরা বাকারার ৭৮ নং আয়াতের উদ্বৃতি দিয়ে বলেনঃ
তাদের মধ্যে এমন আহম্মক লোক আছে যাদের মিথ্যা আশা ব্যতীত কেতাব সম্বন্ধে কোনোই জ্ঞান নেই, তারা শুধু অবাস্তব ধারণায় বিশ্বাসী। –
অর্থাৎ দীর্ঘদিন যদি কোন মিথ্যে শুনতে শুনতে মানুষ যদি অভ্যস্থ হয়ে যায় এবং তার বিপরীত কোন সত্য হাজির না হয়,
তবে সে মিথ্যেটাও একদিন সত্যে পরিনত হয় এবং তা মানব হৃদয়ে মজবুদ এক ভিত গেড়ে বসে।
সে তখন সে ভিত থেকে আর সড়ে আসতে পারে না, যত সত্যই তার কাছে উপস্থাপন করা হোক না কেন।
এবং এই বিশ্বাসের ঘরে কেউ আঘাত করলে তা মেনে নিতে পারে না। এমনকি নিজ সন্তানকেও সে ত্যাগ করতে প্রস্তুত। বন্ধু-বান্ধব, পাড়া পড়শি, আত্মীয়- স্বজন তো দুরে থাক। তার মনে দীর্ঘ দিনের লালিত সে বিশ্বাসের বিপরীতে কোন সত্যকেও উপস্থাপন করা হলে সে আৎকে উঠে। প্রতিহত করতে চায়,বিরোধিতায় লিপ্ত হয় এমন কি জীবন দিতেও প্রস্তুত হয়ে যায়। আর সে বিশ্বাস যদি হয় ধর্মীয় – তবে তো আর কথাই নেই। ফলে অনেককে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের পরও দেখা যায় সে তার গোড়ামীর প্রাচীর ভেদ করে বেরিয়ে আসতে পারে না। তার মুল কারন সত্যটা তার সামনে শুরুতে কোন দিন উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে পৃথিবী নামক গ্রহের বুকে জাতী একটি হলেও ধর্ম চার হাজার অধিক। কেউ কাউকে তার ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত থেকে এক বিন্দু টলাতে সক্ষম নয়।
কারন জন্মগত ভাবে সে এ অনুভুতি গুলো দেখে আসতেছে। বহু পুর্ব হতে বাপ-দাদাদেরকেও এরুপই করতে দেখে এসেছে। সে যাকে,যাকে ভক্তি শ্রদ্ধা করে যাকে ইত্তেবা করে তার মুখেও এমনি শুনে এসেছে। তাই তার অন্য কোন কথা, মতামত কানে পৌছা মাত্র গা জ্বলে উঠে।
অন্যদিকে যে বাণী গুলোকে আপনি নবীর বাণী বলে মনে করেন মুলত সে গুলি শয়তানের বাণী, নবীর নামে প্রচার করা হয়েছে। নবী কখনো অশ্লীল, অবৈজ্ঞানিক, অবাস্তব, অসামাঞ্জস্য কোন কথা কখোনই বলেন নাই বা বলতে পারেন না। কারন তিনি স্বয়ং রব দ্বারা সার্বক্ষন কন্ট্রোলিত ছিলেন। তার প্রমাণ নীচের আয়াতটি পড়লেই বুঝতে পারবেন।
“আমি যদি আপনাকে সতর্ক না করিতাম তবে আপনিতো প্রায় তাদের প্রতি ঝুকেই পড়েছিলেন।” (১৭:৭৪)
এ উপ-মহাদেশের খৃষ্টান মিশনারীদের দ্বারা পরিচালিত মাদ্রাসা গুলিতে হাদীসের সিলেবাসে সীমাবদ্ধ রেখে আলেম নামক ইসলামী স্কলারগন তৈরী হতে থাকে। কোরানের উপর গবেষনা বিমুখ এই আলেমগন নিজেদের প্রজ্ঞা বিবেক প্রয়োগ না করে সত্য মিথ্যে যাচাই এর কোন গবেষনা না করে দরসে হাদীসের অর্জিত জ্ঞানকে তৃপ্তির সাথে সোয়াব ও জান্নাত প্রাপ্তীর আমলে সীমাবদ্ধ করে আম-জনতার মগজে ঢুকিয়ে দিতে থাকে যুগের পর যুগ ।
যা পালন করে সবাই তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আলেমদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে,লক্ষ্য একটাই পরকালের নাজাতের বিষয়ে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয় আলেমগন ধর্মকে জীবন জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নেয়।
শুরু হয় মহল্লায় মহল্লায় মসজিদ মাদ্রাসার গড়ার প্রতিযোগিতা। কর্মস্থলের সুযোগ বৃদ্ধি ও পরিধি প্রসারের মহা উৎসবে তারা ব্যস্ত হয়ে ইসলামকে পাচটি মৌলিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ রেখে জনতাকে কোরান বিমুখ করে তুলে। এতেকরে মানুষ মুল ইসলাম থেকে ছিটকে পরে হুজুর ভিত্তিক দ্বীন ও ধর্ম পালনে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। এর পেছনে কারন ও রয়েছে।
মাত্র ৬৫০ বছর নবী প্রেরনে বিরতি হওয়ায় মানুষ জাহেলিয়াতের অতল গর্ভে তলিয়ে গিয়েছিল। আগে এক দেরশো বছর ব্যবধানেই মানুষকে সঠিক পথে চলার জন্য নবী প্রেরণ করতেন। ঈশা নবীর তিরোধানের পর প্রায় ৬৫০ বছর পর্যন্ত কোন নবী বা রাসুল প্রেরন করেন নাই। এই দীর্ঘ ব্যবধানে মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে জাহেলিয়াতের অতল গর্ভে ডুবে যায়। এর আগে সব নবীই প্রায় ১০০ বছর ব্যবধানেই এসেছেন। দীর্ঘ বিরতির পর এই অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে পাঠালেন নবী মুহাম্মদ সা: কে। আল্লাহ তাই বলেনঃ রাসূল প্রেরণে বিরতির পর আমার রাসূল তোমাদের নিকট আসিয়াছে। সে তোমাদের নিকট স্পষ্ট ব্যাখ্যা করিতেছে যাহাতে তোমরা বলিতে না পার, ‘কোন সুসংবাদবাহী ও সতর্ককারী আমাদের নিকট আসে নাই।’ (৫:১৯) মায়েদাহ
কিন্তু নবী মুহাম্মদ সা: কে শেষ নবী রুপে প্রেরনের পর আর কোন নবী প্রেরণ করবেন না বলে ঘোষণা করা হলো। কারন ছিল অন্য কোন নবীর উপর নাযিল করা কিতাব সংরক্ষন করা হয় নি। কিন্তু শেষ নবীর উপর নাযিলকৃত কিতাব আল কোরআন সংরক্ষনের দায়িত্ত আল্লাহ নিজে নিলেন। তাই কিয়ামত অব্দী আর কোন নবী প্রেরণ করা হবে না। এই কোরানই নবীর দায়িত্ব পালন করবে সঠিক পথ নির্দেশ দিবে মানব সমাজকে।
ঘঠনার বিপর্যয় ঘটল যখন মানুষকে শয়তান কোরান বিমুখ করতে সফল হল। কোরানকে তেলোয়াত আর সোয়াব অর্জনের জন্য ব্যবহার শুরু হল তখন মানুষ সঠিক পথ নির্দেশনা হতে আস্তে আস্তে দুরে সড়ে পড়ে পুনরায় নব্য জাহেলিয়াতে ডুবে গেল। আর এ কাজটি করতে কোরানের পাশাপাশি মানব রচিত হাদীস নামক একাধিক কিতাব রচনা করা হলো। যা মানুষকে কোরানের নির্দেশনার চেয়ে অধিক গুরুত্ত দিতে শিক্ষা দিল মাদ্রাসাগুলিতে কোরানের পরিবর্তে হাদীসের পাঠ্যসুচী প্রধান্য দিয়ে পাঠ্যক্রম করা হলো।
ফলে অবস্থা এমন একটি পর্যায়ে দাড়িয় যে সত্যটা কেউ তুলে ধরলে এই আলেম সমাজই আম জনতাকে হায়েনার মত লেলিয়ে দিয়ে ইহুদী-খৃষ্টানের দালাল,কাদেয়ানী, কাফের ইত্যাদি ইত্যাদি ফতুয়া দিয়ে ফাঁসির দাবীতে মিছিল করে। সত্য পরাভুত হয়ে নীরব অশ্রু ঝড়ায়ে নিগৃহীত।
“হাদিস” শব্দটা কুরআনে বহুল ব্যবহৃত। এর অর্থ কথা, বাণী, কেচ্ছা, সংবাদ। “আল্লাহু নাযযালা আহসানাল হাদিসা–! সুরাতুল যুমারের ২৩ আয়াতে বর্নিত ” আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম হাদীস । সুরা গাশিয়ার শুরতে বলেনঃ “হাল আতাকা হাদিসুল গাশিয়াহ?” –“তোমার কাছে কি কেয়ামতের হাদীস পৌছেছে ?”
খুব অল্প লোকেই এই সত্যটা জানে যে সহীহ সিত্তাহ বা সুন্নিদের যে ছয়টি হাদীস গ্রন্থ আছে , এদের সঙ্কলক কারো বাড়ী মক্কা-মদীনা বা আরব দেশে না এবং এদের কারো মাতৃভাষা আরবি ও না। এরা সকলেই ফার্সি ভাষী ইরানি বংশোদ্ভূত। মজার ব্যাপার হল, এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বগুলি অন্যান্য শত শত ইরানী পণ্ডিতদের মধ্যে মাত্র ছয়জন , যারা সুন্নি ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য গঠনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন।
চিন্তাশীলদের কি খটকা লাগে না আরব বা আরবি ভাষীরা কেনো হাদীসের সঙ্কলন করে নি?
সুদুর উজবিকিস্থান, ইরানে থেকে কেন হাদীসের এই সব বড় বড় আলেমদের আগমন? হাজার বছর আগে যখন উট ও ঘোড়াই ছিল যানবাহনের একমাত্র উপায় , তখন তারা শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে কিভাবে হাদীস জোগাড় করেছেন ও সত্যাতা পরীক্ষা করেছেন? তাদের ভাষাও তো আরবী নয় ।
এ,কে,এম,একরামুল হক www.rbl60.com
