অন্তর আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে —
তবুও কেন জিজ্ঞাসা?
মানুষের সত্তা রহস্যময় এক সংগঠন। তার মধ্যে রয়েছে নফস (আত্মা), ফু’আদ (অন্তর), আক্ল (বুদ্ধি), ক্বলব, রুহ এবং হাওয়াস (ইন্দ্রিয়)। আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা করেন: “নিশ্চয়ই শ্রবণ, দৃষ্টি ও অন্তর — সবকিছুর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।” [ ১৭:৩৬] এই আয়াত আমাদের চমকে তোলে। শ্রবণ ও দৃষ্টির জবাবদিহি সহজবোধ্য হলেও, অন্তর বা ফু’আদের জিজ্ঞাসা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে — “যদি অন্তর فُؤَادٌ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে তার জন্য মানুষ দায়ী কীভাবে?” এই প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানব স্বাধীনতা, আল্লাহর হিকমাহ, এবং আখিরাতের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কিত এক গভীর উপলব্ধি। ⛑️ অন্তর ও নফস: দ্বৈত বাস্তবতা নফস (نَفْسٌ) হলো মানুষের চেতন সত্তা — যার দ্বারা সে সিদ্ধান্ত নেয়, ইচ্ছা করে, কর্ম সম্পাদন করে। অন্তর (فُؤَادٌ / قَلْبٌ) হলো সেই স্থান যেখানে আবেগ, উপলব্ধি, ভালো-মন্দের অনুভব জন্ম নেয়। কুরআন বলছে:“তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না, যাতে তাদের এমন অন্তর হয় যা দিয়ে তারা উপলব্ধি করতে পারে? [সূরা হাজ্জ ২২:৪৬] অর্থাৎ অন্তর নিছক মাংসপিণ্ড নয়; এটি উপলব্ধি শক্তি সম্পন্ন, বিচারক্ষম একটি মাধ্যম — এবং তাই এটি জবাব দিহির উপযুক্ত। 📌 অন্তর কি আল্লাহর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে? হ্যাঁ, আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ যার অন্তর খুলে দেন ইসলামের জন্য, সে তো তার রবের পক্ষ থেকে আলোতে আছে।” [সূরা যুমার ৩৯:২২] আবার: “আল্লাহ যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন, আর যাকে চান হিদায়াত দেন।” [ ৩৫:৮] এখান থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ অন্তরের হেদায়াহ বা গোমরাহি নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ⛑️ তাহলে মানুষের দায় কোথায়? এ প্রশ্নের জবাব কুরআনই দেয়:“তারা অন্তরে রোগ বহন করে, আর আল্লাহ তাদের রোগ আরও বাড়িয়ে দেন। [সূরা বাকারা ২:১০] লক্ষ্য করুন: অন্তরের “রোগ” আগে থেকেই ছিল, তারপর আল্লাহ তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাকে গোমরাহি করেন। অর্থাৎ:মানুষ তার অভিমুখ নির্ধারণ করে (চায় কি না), তারপর আল্লাহ তা মোতাবেক অন্তরের দরজা খুলে দেন বা বন্ধ করেন। এটি একটি ঈশ্বরীয় ন্যায় বিচারের প্রক্রিয়া — যেখানে মানুষের “মুল ইচ্ছা” অনুধাবন করেই অন্তরের নিয়ন্ত্রণ হয়। ⛑️ হৃদয়ের কাজ কী? “যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আসে, সেই ব্যক্তি রক্ষা পাবে।” [ ২৬:৮৯] “বিশুদ্ধ অন্তর” নিয়ে আসা মানে কী? এ মানে হচ্ছে — মানুষের অন্তর নিজের ইচ্ছায় আল্লাহর দিকে ফিরে গেছে, এবং সে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছে। আবার আয়াতে বলা হয়েছে:“তাদের অন্তর অন্ধ হয়ে গেছে। [সূরা হাজ্জ ২২:৪৬] 🛂 অন্ধ হৃদয় কখনো নির্দোষ নয়। 🛂 এটি তার উপলব্ধির ক্ষমতা ব্যবহার না করায় দোষী ⛑️ অন্তর ও নফসের সংযোগঃ নফস ইচ্ছা করে, চায় বা প্রত্যাখ্যান করে। অন্তর অনুভব করে, প্রতিক্রিয়া দেয়, অনুপ্রাণিত হয়। এই দুইয়ের সমন্বয়েই মানুষ দায়িত্ববান। তাই কুরআন বলছে: “শ্রবণ, দৃষ্টি ও হৃদয় — সবকিছুর ব্যাপারে প্রশ্ন করা হবে।” কারণ, এ তিনটি জ্ঞান অর্জনের পথ— যা মানুষ তার ইচ্ছায় ব্যবহার করে অথবা অপব্যবহার করে। ✅ উপসংহারঃ হ্যাঁ, অন্তর আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে থাকে — কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ মানব-ইচ্ছার প্রতিক্রিয়া। আল্লাহ প্রথমে মানুষের অন্তরে জোরপূর্বক কিছু চাপিয়ে দেন না। মানুষ যেদিকে মন ঝোঁকায়, আল্লাহ সেদিকেই তাকে পরিচালিত করেন। তাই হৃদয় সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করা হবে, কারণ, সে ছিল মানুষের মধ্যস্থ উপলব্ধি কেন্দ্র।যার দ্বারাই সে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারত। ⛔ পরিশেষে…সতর্কতা এই যে: আমরা যেন অন্তরকে হাওয়া-নফসের হাতে তুলে না দিই। বরং কুরআনের আলোয় ও আল্লাহর স্মরণে তাকে স্থির রাখি। “নিশ্চয়ই, এতে রয়েছে উপদেশ, যার অন্তর আছে তার জন্য…” [সূরা ক্বাফ ৫০:৩৭] ✒️ লেখক: এ,কে,এম,একরামুল হক।
