Categories
Blog

সুপারিশকারী বা মাধ্যম

 

আল্লাহর কাছে পৌঁছতে সুপারিশকারী বা মাধ্যম—পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের বিশ্বাস?

আল্লাহর কাছে পৌঁছতে কি কোনো সুপারিশকারী, মধ্যস্থতাকারী কিংবা বিশেষ কোনো মাধ্যম অপরিহার্য—এমন ধারণা কি পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের মধ্যেও ছিল?

কুরআনের বক্তব্য গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এমন একটি বিশ্বাসের সুস্পষ্ট চিত্র কুরআনে উপস্থাপিত হয়েছে। সেখানে আল্লাহকে অস্বীকার করাই মূল বিষয় ছিল না; বরং আল্লাহর সঙ্গে অন্য সত্তাকে এমন এক ধর্মীয় ভূমিকা দেওয়া হয়েছিল, যাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার মাধ্যম অথবা সুপারিশকারী হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায়ের আলিহাহ বা সুপারিশকারী বিষয়ে: 

নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায়কে তাদের নেতৃস্থানীয় ধর্ব্যমীয় পন্ডিত গণ  বলেছিল— لَا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا

“তোমরা তোমাদের আলিহাহকে কখনো পরিত্যাগ করো না; এবং ওয়াদ্দ, সুওয়া‘, ইয়াগূছ, ইয়াউক ও নাসরকেও পরিত্যাগ করো না।” সূরা নূহ ৭১:২৩

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, وَدًّا (ওয়াদ্দ), سُوَاعًا (সুওয়া‘), يَغُوثَ (ইয়াগূছ), يَعُوقَ (ইয়াউক) এবং نَسْرًا (নাসর)—এই পাঁচটি নামকে সরাসরি آلِهَتَكُمْ (আলিহাহ)-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ এগুলো তাদের উপাস্যদের পরিসরের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আল্লাহকে অস্বীকার নয়—বরং অন্যদের মাধ্যমে নৈকট্য লাভ এর পথ।

কুরআন অন্য একটি আয়াতে এমন এক মানসিকতার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। বলা হয়েছে— وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَٰؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِندَ اللَّهِ

“তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর উপাসনা করে, যা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে না এবং কোনো উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, ‘এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী।’ (১০:১৮)

এখানে তাদের বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: هَٰؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِندَ اللَّهِ “এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী।”

অর্থাৎ সমস্যাটি এমন নয় যে তারা আল্লাহর অস্তিত্বই অস্বীকার করছিল। বরং তারা অন্য সত্তাদের আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিশেষ ধর্মীয় ভূমিকা প্রদান করছিল—আল্লাহর কাছে সুপারিশকারী হিসেবে।

আরও একটি আয়াতে এই ধারণাটি আরও স্পষ্ট ভাষায় এসেছে। مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ

“আমরা তাদের উপাসনা করি শুধু এজন্য যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।” সূরা আয-যুমার ৩৯:৩

এখানে ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়: لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّ

“যাতে তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে।”

অর্থাৎ তাদের বিশ্বাসের কাঠামো ছিল—আল্লাহ আছেন, কিন্তু তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য অন্য সত্তার প্রয়োজন রয়েছে।

এখানেই শিরকের একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দিক প্রকাশ পায়।

শিরক সবসময় “আল্লাহ নেই”—এই ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় না।

বরং কখনো তার রূপ হতে পারে— “আল্লাহ আছেন; কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছতে আমাদের কিছু বিশেষ সত্তার প্রয়োজন।”

এই সত্তাদের কেউ হতে পারে উপাস্য, কেউ সুপারিশকারী, কেউ নৈকট্য লাভের মাধ্যম, কেউ অভিভাবক বা আশ্রয়দাতা।

কুরআন এমন ব্যক্তিদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলছে— أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ “জেনে রাখো, বিশুদ্ধ আনুগত্য আল্লাহরই জন্য।”

এরপর বলা হয়েছে— وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ

“আর যারা তাঁকে ছাড়া অভিভাবক গ্রহণ করেছে, তারা বলে, ‘আমরা তাদের উপাসনা করি শুধু এজন্য যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।’ (৩৯:৩) 

কুরআনের বক্তব্য তাই অত্যন্ত পরিষ্কার—আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য কোনো সত্তাকে অপরিহার্য ধর্মীয় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করার ধারণা কুরআন সমর্থন করছে না; বরং এই বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যানের প্রসঙ্গেই উপস্থাপন করছে। 

নূহ (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে আমরা দেখি, তাদের নেতৃস্থানীয় ধর্মগুরু আলেমগন  তাদের পুরোনো উপাস্যদের পরিত্যাগ না করতে বলেছিল:

“তোমরা তোমাদের আলিহাহ (মাধ্যম) পরিত্যাগ করো না; ওয়াদ্দ, সুওয়া‘, ইয়াগূছ, ইয়াউক ও নাসরকেও পরিত্যাগ করো না।” সূরা নূহ ৭১:২৩

অন্যদিকে কুরআন শিরকী বিশ্বাসের একটি সাধারণ যুক্তি তুলে ধরে:

“এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। সূরা ইউনুস ১০:১৮ এবং “আমরা তাদের উপাসনা করি শুধু এজন্য যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।” সূরা আয-যুমার ৩৯:৩

এখন প্রশ্ন হলো—এই মানসিকতা কি কেবল অতীতের কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল?

কুরআন যখন পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের এই বিশ্বাসকে আমাদের সামনে তুলে ধরে, তখন বিষয়টি কেবল ইতিহাস জানার জন্য নয়; বরং মানুষের ধর্মীয় চিন্তার একটি প্রবণতা বোঝার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আজ যদি কেউ মূর্তি বা প্রতিমাকে সরিয়ে দিয়ে কোনো পীর, বুজুর্গ, আলেম, মুর্শিদ বা রাহবারকে এমন অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করে যে, আল্লাহর কাছে পৌঁছতে তাঁর প্রয়োজন, তাঁর মাধ্যম ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ সম্ভব নয়, অথবা তিনি বিশেষভাবে আল্লাহর কাছে অপরিহার্য সুপারিশকারী—তাহলে প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে:

মূর্তির পরিবর্তন ঘটেছে, নাকি ধর্মীয় মধ্যস্থতার ধারণাটিই অন্য রূপে টিকে আছে?

By Ekramul hoq

I am A.K.M Ekramul hoq MA.LLB. Rtd Bank Manager & PO of Agrani Bank Ltd. I am interested writing and reading. Lives in Bangladesh, District Jamalpur.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

``` }