Categories
Blog

মানুষের ভালবাসা

মানুষ কখনোই মানুষকে ভালবাসে না, ভালবাসে তার স্বভাব–ইচ্ছাশক্তিকে বা নফসকে। আর স্বভাবের সাথে যখন মিলে যায় তাকে সে ভালবাসতে শুরু করে।”

কুরআনের আলোকে অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কুরআন মানুষের ভালবাসা, আকর্ষণ, বন্ধুতা—এসবকে নফস, হাওয়া, শখ এবং অভিরুচি-র সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করে। অর্থাৎ মানুষের ভালবাসা বাস্তবে অধিকাংশ সময় নিজের নফসের মিল থেকে জন্ম নেয়, অন্য মানুষের প্রকৃত কল্যাণচিন্তা থেকে নয়।

নীচে বিষয়টি কুরআনের ভাষায় বিশ্লেষণ করা হল:

১) মানুষের ভালবাসার মূল উৎসকে কুরআন “হাওয়া/আকাঙ্ক্ষা” বলে চিহ্নিত করে

﴿ أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَـٰهَهُ هَوَاهُ ﴾

“তুমি কি দেখেছ তাকে, যে তার হাওয়া (নফসের ইচ্ছা/চাওয়া)-কে নিজের উপাস্য বানিয়েছে?”(45:23)

অর্থাৎ মানুষ বহু সময় এমন ব্যক্তিকে ভালবাসে বা অনুসরণ করে— কারণ সেই ব্যক্তি তার নফসকে তৃপ্ত করে, তার স্বভাব, পছন্দ, অনুভূতির সাথে মিল রাখে। এ ভালবাসা “মানুষের জন্য” নয়—বরং নিজের ইচ্ছার সঙ্গে মিল পাওয়ার কারণে।

২) মানুষ যে জিনিসকে ভালবাসে—তা আসলে নিজের চাওয়ার প্রতি আকর্ষণ زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ “মানুষের কাছে শহাওয়াত (নফসের কামনা/ঝোঁক) সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। (3:14)

অর্থাৎ মানুষ যা-ই ভালবাসুক— ধন, নারী, সন্তান, সম্মান, বন্ধুত্ব— এগুলি আসলে নফসের আকর্ষণ।

তার মানে মানুষকে নয়, তার মাধ্যমে নিজের নফস তৃপ্ত হয় বলে সে ভালবাসে।

৩) মানুষের সম্পর্কের ভিত্তি যখন নফস—তখন বন্ধুত্ব বা ভালবাসা বদলে যায়

 الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ

“সেদিন (কিয়ামতে) সকল ঘনিষ্ঠ বন্ধু একে অন্যের শত্রু হয়ে যাবে— শুধু মুত্তাকীদের ছাড়া।” সূরা যুখরুফ 43:67

কারণ: যাদের সম্পর্ক আল্লাহর জন্য নয় বরং নফসের স্বভাব, আরাম, উপকার—সেসব সম্পর্ক কিয়ামতে ভেঙে যাবে। কারণ সে ভালবাসা ছিল নিজেকে, অন্যকে নয়।

৪) কুরআন বলছে—মানুষ যখন নিজস্ব স্বভাবের সাথে মিল পায়, তখনই কারো প্রতি আকৃষ্ট হয়

এ আয়াতটি আপনার বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি মিলে যায়:

 وَلَوْ رُدُّوا لَعَادُوا لِمَا نُهُوا عَنْهُ لَإِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ

— সূরা আল-আন‘আম 6:28

ব্যাখ্যা: মানুষের নফস ও স্বভাব তাকে সেই কাজের দিকে টানে যেখানে সে অভ্যস্ত। যাকে সে ভালোবাসে, তাকে সে নিজস্ব স্বভাবের মিল খুঁজে পেয়ে ভালবাসে।

অতএব সম্পর্ক গড়ে ওঠে মানুষের “স্বভাব” (طبع) — “ইচ্ছা” (هوى) — “নফস” (نفس) এর মিলের উপর।

৫) কুরআন মানুষের ভালবাসাকে পরীক্ষার নামে উল্লেখ করে। إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ

“তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান কেবলই পরীক্ষা।” সূরা আত-তাগাবুন 64:15

অর্থাৎ সন্তান বা ঘনিষ্ঠজনকে ভালবাসা আসলে নিজের নফসের পরীক্ষা। কারণ মানুষ তাদের এত ভালবাসে যতক্ষণ তারা তার নফসকে আনন্দ দেয়,অর্থাৎ তার মন মতো চলে।

৬) কুরআন সত্যিকারের ভালবাসাকে আল্লাহর পথে সীমাবদ্ধ রাখে

নফসের মিলভিত্তিক ভালবাসা নয়, বরং— وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ “মুমিনরা আল্লাহকে সর্বাধিক ভালবাসে।” (2:165)

এ একমাত্র ভালবাসা “অন্যের জন্য”, অন্য সব ভালবাসা “নিজের নফসের জন্য”।

কুরআন বলে: মানুষের অধিকাংশ ভালবাসা হাওয়া/নফস ভিত্তিক। অপরের স্বভাব নিজের নফসের সাথে মিললে ভালবাসা জন্মে। মানুষ প্রকৃতপক্ষে অন্যকে নয়— নিজের নফসের তৃপ্তি, স্বভাবের সাদৃশ্য, অভ্যাসের আরামকেই ভালবাসে।

সত্যিকারের “নফস–মুক্ত” ভালবাসা কেবল আল্লাহর পথে থাকতে পারে; মানুষ–মানুষের সম্পর্কের ৯৯% নফস ভিত্তিক — কুরআন এটাই শিক্ষা দেয়।

By Ekramul hoq

I am A.K.M Ekramul hoq MA.LLB. Rtd Bank Manager & PO of Agrani Bank Ltd. I am interested writing and reading. Lives in Bangladesh, District Jamalpur.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *