শ্যামপুর মিয়া বাড়ির স্মৃতির পাতায় শাবানা
শ্যামপুর মিয়া বাড়ির আঙিনায় যে বাতাস বয়ে যায়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অগণিত স্মৃতি, অগণিত গল্প। সেখানেই জন্ম নেয় একদিন এক ফুটফুটে কন্যা, যে রত্না থেকে শাবানা হয়ে ছাপ ফেলেছিল সমগ্র বাংলার হৃদয়ে।
কিন্তু এর শুরুটা আরও আগে—
জেবুন নেসা জোছনা ছিলেন শ্যামপুর মিয়া বাড়ির দ্বিতীয় কন্যা। তার বাবা সাইদুর রহমান, ছিলেন জমিদার হামিদুর রহমান বড় মিয়ার বড় ছেলে। জেবুন নেসার মা ছাবিরন নেছা, আর বড় মামা ছিলেন মজিবুর রহমান। পরিবারের চোখের মণি ছিলেন জোছনা। কে জানত, তার গর্ভেই একদিন জন্ম নেবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র—শাবানা।
🌿 বন্ধুত্ব থেকে আত্মীয়তা
১৯৫০ সালের ঢাকা শহর। ব্যস্ত নগরীর এক প্রান্তে ফুট ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন মজিবুর রহমান। সেখানেই নাটকীয়ভাবে পরিচয় হয় এক সুদর্শন, ডগবকে তরুণের সঙ্গে—তার নাম ফয়েজ চৌধুরী।
ফয়েজ চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রামের রাউজান চৌধুরী পরিবারের সন্তান। পারিবারিক জটিলতায়, বিশেষত বৈমাতার সঙ্গে বিরোধের কারণে তিনি ১৯৫০ সালে আপন ভিটে ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। অচেনা শহরে ছন্নছাড়া জীবনযাপন করতে করতে হঠাৎই মজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা। বাস্তবতা ও নৈতিকতায় ভরা এই তরুণের চরিত্রে এমন কিছু ছিল, যা দেখে মজিবুর রহমান মুগ্ধ না হয়ে পারলেন না। ধীরে ধীরে গড়ে উঠল গভীর বন্ধুত্ব।
বন্ধুত্বের সূত্র ধরে ফয়েজ চৌধুরীর যাতায়াত শুরু হলো শ্যামপুর মিয়া বাড়িতে। সুদর্শন রূপ, ভদ্রতা আর চরিত্রের দৃঢ়তায় তিনি মুহূর্তেই মুগ্ধ করে ফেললেন পুরো পরিবারকে।
একদিন মজিবুর রহমান মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন—এই বন্ধুত্বকে শুধু ক্ষণিকের নয়, চিরস্থায়ী করে তুলবেন। তাই তিনি তাঁর ছোট বোন জেবুন নেসা জোছনাকে ফয়েজ চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করার প্রস্তাব দিলেন বাবা-মাকে। পরিবারও দ্বিমত করল না।
এক নতুন সূচনা
১৯৫২ সালের মার্চ মাসে ফয়েজ চৌধুরী ও জেবুন নেসা জোছনার বিয়ে হলো।
ফয়েজ চৌধুরী ছিলেন চমৎকার হাতের লেখার অধিকারী এবং তদানীন্তন সময়ের দক্ষ সাঁটলিপিকার। বিয়ের পর দুই বন্ধু—মজিবুর রহমান ও ফয়েজ চৌধুরী—একই ছাদের নিচে হাতিরপুলে বসবাস শুরু করলেন।
বন্ধুত্বের বাঁধন আরও দৃঢ় হলো। মজিবুর রহমানের সহায়তায় ফয়েজ চৌধুরী যোগ দিলেন ঢাকা সুপ্রিম কোর্টে মুদ্রাক্ষরিক পদে। জীবনের ছন্নছাড়া পথ তখন রূপ নিল স্থিতিশীলতায়।
নতুন প্রাণের আগমন
ক্রমে উভয় বন্ধুর পরিবার পূর্ণতা পেতে শুরু করল। ১৯৫২ সালে মজিবুর রহমানের ঘরে জন্ম নিল এক কন্যা—আফরোজা রহমান হেলেন। এরপর ১৯৫৪ সালে আরেক কন্যা এল—মাহবুব রহমান বেলুন।
বন্ধুর আনন্দ ভাগাভাগি করার যেন এক অদ্ভুত মিলনমেলা চলছিল। ১৯৫৫ সালের মার্চ মাসে ফয়েজ চৌধুরীর ঘর আলো করে জন্ম নিল এক ফুটফুটে কন্যা। পরম আদরে তার নাম রাখা হলো—আফরোজা চৌধুরী রত্না।
বন্ধুর ঘরে যেমন আফরোজা, তেমনি নিজের ঘরে একই নাম রেখে যেন মজিবুর ও ফয়েজের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হলো।
কিন্তু ভাগ্য রত্নার জন্য এক ভিন্নতর অধ্যায় রচনা করেছিল। সেই রত্নাই পরবর্তীতে হয়ে উঠবে বাংলার চিত্রপর্দার মায়াবী নায়িকা—শাবানা।
🌺 রত্না থেকে শাবানা
রত্না নামটি একদিন পাল্টে গেল শাবানা হয়ে। নাম বদলের পেছনেও ছিল এক মজার ঘটনা, এক মধুর কাহিনি—যা পরে আলোকপাত করা হবে। তবে এটুকু সত্য, রত্নার আঙুল ধরেই মল্লিকা বনে শাবানা ফুটেছিল, আর আলো ছড়িয়েছিল পুরো বাংলার সিনেমার জগতে।
রত্না থেকে শাবানানা নামের আড়ালে এক স্বপ্নের জন্মঃ
আফরোজা চৌধুরী রত্না—একটি ঘরের আদুরে নাম। বাবা ফয়েজ চৌধুরী ও মা জেবুন নেসা জোছনার পরম যত্নে বেড়ে ওঠা এই মেয়ে ছিল যেন পরিবারের নয়নের মণি।
কিন্তু নিয়তি তার কপালে বুনে রেখেছিল অন্য এক পরিচয়, অন্য এক নাম, যা শুধু পরিবারের নয়—সমগ্র দেশের মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বাজবে।
🎥 সিনেমার দোরগোড়ায়
রত্না বড় হতে হতে অসাধারণ সৌন্দর্য, লাবণ্য ও অভিনয়ের স্বাভাবিক প্রতিভা দিয়ে সকলকে মুগ্ধ করলেন।চলচ্চিত্র জগতের এক পরিচালক ( মুস্তাফিজ) একদিন তার প্রতিভার দীপ্তি চিনে ফেললেন। বললেন— “এই মেয়েটির চোখে যে জ্যোতি, তা শুধু ঘরের চার দেওয়ালের জন্য নয়। ওর জন্য রুপালি পর্দাই উপযুক্ত।”
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ১৯৬৬ সালের ২৯শে জুলাইয়ের দিনটি এক বিশেষ অধ্যায় হয়ে আছে।
মুস্তাফিজ পরিচালিত “ডাক বাবু” নামের ছবিটি সেদিন মুক্তি পেয়েছিল ঢাকায়—তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। সাদা-কালো আলোছায়ার সেই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সুজাতা, আজিম, শবনম, দীপ্তি ও মনজুর মতো তারকারা। কিন্তু সিনেমার খণ্ড দৃশ্যে হঠাৎ করেই পর্দায় দেখা মেলে এক কিশোরীর—রত্না। তার সাথেই ছিলেন তরুণ রাজ্জাক, যিনি পরবর্তীতে হয়ে উঠবেন বাংলা চলচ্চিত্রের চিরচেনা নায়ক।
এই ছবির একটি দৃশ্যে, ষ্টেশন মাস্টারের ভূমিকায় ছিলেন রত্নার মামা মজিবুর রহমান, আর ওয়েটিং রুমের যাত্রী বন্ধু হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন ফয়েজ চৌধুরী। পারিবারিক আবহ, শৈশবের সরলতা ও আকস্মিক সুযোগ—সবকিছু মিলে রত্নার সেই প্রথম পর্দায় আবির্ভাব হয়ে উঠেছিল চলচ্চিত্র জগতের অমূল্য সূচনা।
যদিও ডাক বাবু ছবিটি বক্স অফিসে তেমন জোরালো সাড়া ফেলতে পারেনি, তবুও এখান থেকেই রাজ্জাক ও রত্নার চলচ্চিত্র যাত্রার প্রথম ধাপ শুরু হয়। রাজ্জাকের জন্য সেই পথ খুলে দেয় পরবর্তী বেহুলা ছবির নায়কোচিত খ্যাতি, আর রত্নার জন্য ছিল অপেক্ষায় আরেক বিস্ময়কর অধ্যায়।
সেই ডাক বাবু সিনেমার একটি গান শুনা যাক। ওগো তুমি দুরে থেকে —-
রত্না থেকে শাবানা—নামকরণের গল্প
রত্নার কিশোরী অভিনয় দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন বিখ্যাত পরিচালক ক্যাপ্টেন এহতেশাম। তখন তিনি কাজ করছিলেন তার বহুল প্রতীক্ষিত ছবি “চকোরী”-তে। নায়ক হিসেবে নির্ধারিত ছিলেন নাদিম, আর নায়িকা হওয়ার কথা ছিল শবনম। কিন্তু শবনম নানা কারণে ছবির চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে, এহতেশামের চোখে পড়ে সেই নবীনী—রত্না।
চলচ্চিত্রের প্রথা মেনে কিংবা হয়তো নতুন পরিচয় গড়ার ইচ্ছায়, এহতেশাম প্রস্তাব দিলেন নতুন নামের। তিনি রাখতে চেয়েছিলেন “শাবানা”। পরিচিতজন ফয়েজ চৌধুরীর চাচাতো ভাই হওয়ার সুবাদে, রত্না সহজেই তা মেনে নিলেন।
ফয়েজ চৌধুরী, যিনি ছিলেন উচ্চ নৈতিকতার মানুষ, বললেন—“নাম বদলালে আমার মেয়ে বদলে যাবে না। সে যেখানেই থাকুক, শিকড়ের কথা ভুলবে না।”
পরে অবশ্য এই নাম রূপ নিল “শাবানা”য়—যা এক সময় হয়ে উঠল পুরো বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের প্রতীকী নাম।
১৯৬৭ সালে মুক্তি পাওয়া চকোরী ছবিটি ছিল শাবানার নায়িকা হিসেবে প্রথম পূর্ণাঙ্গ অভিনয়। ছবিটি মুক্তির পর সাড়া জাগায় পুরো দেশজুড়ে। টানা ৮১ সপ্তাহ প্রেক্ষাগৃহে চলতে চলতে এটি লাভ করে হিরক জয়ন্তীর সম্মান। নিগার পুরস্কারসহ বহু স্বীকৃতি এই ছবিকে অমর করে রাখে, আর শাবানা নামের অভিনেত্রীকে পৌঁছে দেয় আকাশ ছোঁয়া খ্যাতিতে।
চকোরী সিনেমার একটি দৃশ্যে শাবানা
এক নামের আড়ালে এক কাহিনি
রত্না হয়তো ভাবেননি তার সরল পদচারণা একদিন শাবানা নামে কিংবদন্তি হয়ে উঠবে। ডাক বাবুর ছোট্ট দৃশ্য থেকে শুরু করে চকোরীর বিশাল সাফল্য—প্রতিটি ধাপ ছিল যেন তার জীবনের নতুন অধ্যায়। নামের পরিবর্তন শুধু পরিচয় বদল নয়, ছিল এক সৃষ্টিশীল যাত্রার সূচনা।
এভাবেই রত্না থেকে শাবানা হয়ে ওঠা—এক কিশোরীর সাধারণ সূচনা থেকে কিংবদন্তি নায়িকার জন্মকথা—বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ইতিহাসে অমলিন হয়ে আছে।
নতুন আলোকচ্ছটাঃ
শাবানা নামটি যেন আশ্চর্য জাদু বয়ে আনল। সেই নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেল খ্যাতি, সম্মান ও ভালোবাসা। চলচ্চিত্রে একের পর এক চরিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে উঠলেন লক্ষ মানুষের হৃদয়ের রানী।
শাবানা নামটি যেন আশ্চর্য জাদু বয়ে আনল। সেই নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেল খ্যাতি, সম্মান ও ভালোবাসা।
চলচ্চিত্রে একের পর এক চরিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে উঠলেন লক্ষ মানুষের হৃদয়ের রানী।
কিন্তু পর্দার শাবানার অন্তরে তিনি আজীবন থেকে গেলেন রত্না— শ্যামপুর মিয়া বাড়ির উঠোনে বেড়ে ওঠা এক অসাধারণ মেয়ে রত্না।
জেবুন নেসা জোছনা (স্বামী: ফয়েজ চৌধুরী) তিন পুত্র তিন কন্যার জননী। পুত্ররা হলেনঃ
১) আবিদুর রেজা চৌধুরী রিজভী,
২) আবিদুর মুরছালিন রিপন,
৩) আব্দুস সালেহীন শাহিন
কন্যারা হলেনঃ
১) আফরোজা সুলতানা রত্না (শাবানা),
২) নাসরিন সুলতানা রঞ্জিতা।
৩) তাহমিনা সুলতানা রিতা।
তারা সবাই আমেরিকায় বসবাস করেন।
জেবুন নেসা জোসনার বংশ ট্রী চার্ট
□ জমিদার হামিদুর রহমান বড় মিয়া
├─□ সাইদুর রহমান
│ ├─□ মজিবুর রহমান
│ │ ├─□ একরামুল হক রুবেল
│ │ ├─□ এনামুল হক জুয়েল
│ │ ├─□ আফরোজা রহমান হেলেন
│ │ ├─□ মাহবুবা রহমান বেলুন
│ │ ├─□ মাহমুদা রহমান হাসি
│ │ ├─□ মাকসুদা রহমান খুশি
│ │ ├─□ মাহফুজা রহমান লিপি
│ │ └─□ মুনছুরা রহমান ডলি
│ │
│ ├─□ হাফিজুর রহমান
│ ├─□ হাবিবুর রহমান
│ ├─□ মোখলেছুর রহমান
│ │
│ ├─□ ফজিলাতুন নেসা
│ ├─□ জেবুন নেসা জোছনা
│ │ ├─□ আবিদুর রেজা চৌধুরী | |
│ │ ├─□ আবিদুর মুরছালিন রিপন
│ │ ├─□ আব্দুস সালেহীন শাহিন
│ │ ├─□ আফরোজা সুলতানা রত্না | | (শাবানা)
│ │ ├─□ নাসরিন সুলতানা রঞ্জিতা
│ │ └─□ তাহমিনা সুলতানা রিতা
│ │
│ ├─□ শামসুন নাহার চম্পা
│ └─□ নুরুন নাহার আঙুর
│
├─□ হানিফ মিয়া
├─□ সালোমন
└─□ কুসুমন
