একটি বিবেক জাগ্রতকারী দাওয়াত
মানুষ যতদিন নিজের বিশ্বাস ভাঙতে রাজি না হয়, ততদিন সবচেয়ে কঠিন মিথ্যাও তার কাছে সত্য বলে মনে হয়। আর যখন কেউ লালিত বিশ্বাসে অনড় থাকে—তখন সুস্পষ্ট সত্যও তার চোখে মিথ্যা হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতাকেই কুরআন এক বাক্যে প্রকাশ করেছে— وَمَا يَسْتَوِى الْاَعْمٰى وَالْبَصِيْرُ “অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান নয়।” (সূরা ফাতির, ৩৫:১৯) চোখ থাকলেই দেখা যায় না— দেখতে হলে সত্য গ্রহণের সাহস থাকতে হয়। মানুষ নয়, কিতাবের আনুগত্য কুরআন স্পষ্ট করে সতর্ক করেছে— “যদি তোমরা তোমাদেরই মত একজন মানুষের আনুগত্য কর, তবে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (সূরা মুমিনূন, ২৩:৩৪)
তবুও যখন মানুষকে বলা হয়— “আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, সেটির অনুসরণ কর”, তখন অধিকাংশ মানুষ উত্তর দেয়— وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا “আমরা তো আমাদের বাপ-দাদাদের যে পথে পেয়েছি, সেটাই অনুসরণ করব।” (সূরা আল-বাকারা, ২:১৭০)
কুরআন প্রশ্ন তোলে— যদি সেই পূর্বপুরুষরা না বুঝে, না জানে, না হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়—তবুও কি? সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি সত্যের মানদণ্ড? মানুষ তখন আরেকটি যুক্তি দাঁড় করায়— “অধিকাংশ মানুষ যেভাবে ধর্ম পালন করে, আমিও তো তাই করি।” এর জবাবে আল্লাহ বলেন— وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ “তুমি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ কর, তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী করবে।” (সূরা আল-আন‘আম, ৬:১১৬)
সত্য কখনো সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। সত্য নির্ভর করে ওহির ওপর। আলেমের অনুসরণ—কিন্তু কোন আলেম? এরপর প্রশ্ন ওঠে— “তবে কি আলেম-হুজুরদের অনুসরণ করাও ভুল?” কুরআন এর উত্তর ভারসাম্য পূর্ণভাবে দেয়— اتَّبِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ “তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল হয়েছে, সেটিরই অনুসরণ কর।” (সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:৩)
এবং সতর্ক করে— إِنَّ كَثِيرًا مِنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ… “অনেক পণ্ডিত ও ধর্মীয় নেতা মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দেয়।” (সূরা আত-তাওবা, ৯:৩৪) তবে আল্লাহ স্পষ্ট করে দেন— সকল আলেম নয়, বরং— اتَّبِعُوا مَنْ لَا يَسْأَلُكُمْ أَجْرًا وَهُمْ مُهْتَدُونَ “তাদের অনুসরণ কর, যারা তোমাদের কাছে কোনো বিনিময় চায় না এবং যারা সুপথপ্রাপ্ত।” (সূরা ইয়াসীন, ৩৬:২১)
জ্ঞান ছাড়া অনুসরণ—একটি অপরাধ কুরআন ঘোষণা করে— وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ “যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩৬)
কারণ কান, চোখ ও অন্তর— সবকিছুরই জবাবদিহি আছে। কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পরিণতি যারা শত প্রমাণ দেখেও কুরআন বিমুখ থাকে— তাদের সম্পর্কে রাসূল ﷺ কিয়ামতের দিন অভিযোগ করবেন— وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا “হে আমার রব! আমার সম্প্রদায় এই কুরআনকে পরিত্যক্ত করেছে।” (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৩০)
কুরআনই আলো, কুরআনই পথ আল্লাহ ঘোষণা করেন— يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ… “এই কিতাবের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনেন।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:১৬) إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ “এই কুরআনই সবচেয়ে সরল পথে পথনির্দেশ করে।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৯)
শেষ আহ্বান أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ “তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না?” (সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:২৪) হে পাঠক, আজ প্রশ্ন একটাই— তুমি কি বংশের মুসলমান থাকবে, নাকি কুরআনের মুসলমান হবে? আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে কুরআনের আলোয় নিজেদের সংশোধন করার তাওফিক দেন। আমিন।
