তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ; তিনিই প্রকাশ্য এবং তিনিই অপ্রকাশ্য। ৫৭:৩ – এ আয়াত কি বার্তা দেয়?
এই আয়াত আমাদের সামনে এক গভীর অস্তিত্বগত প্রশ্ন উপস্থিত করে—“প্রথম” বলতে কী বোঝায়? “শেষ” বলতে কী বোঝায়? আর “প্রকাশ্য” ও “অপ্রকাশ্য” বলতে কী নির্দেশ করা হচ্ছে?
যদি আল্লাহই একক পরম অস্তিত্ব হন এবং তাঁর বাইরে কোনো স্বাধীন চূড়ান্ত অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে মহাবিশ্ব, গ্রহ নক্ষত্র,বায়ূ, পানি ইত্যাদি সকল জীব ও জড় পদার্ঘ, এমন কি প্রাণের অস্তিত্ব যে হলো—সেগুলোর মৌলের উৎস কী?
তাই সৃষ্টির চূড়ান্ত উৎসও তাঁর বাইরে খোঁজা যায় না।
অতএব দার্শনিকভাবে বলা যায়—সৃষ্ট জগতের চূড়ান্ত ভিত্তি আল্লাহর বাইরে কোনো স্বাধীন সত্তা নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে সৃষ্টি আল্লাহর ‘অংশ’। বরং সৃষ্টি তাঁর ইচ্ছা, আদেশ ও সৃষ্টিশক্তির অধীন অস্তিত্ব লাভ করেছে।
যদি আদিতে আল্লাহই পরম একক ও সর্বময় উৎস হন, তবে সৃষ্টির জন্য তাঁর বাইরে আর কোনো স্বাধীন চূড়ান্ত উপাদান বা উৎস থাকা যুক্তিগতভাবে কঠিন। কারণ সেই দ্বিতীয় উৎসও যদি অনাদি ও স্বাধীন হয়, তবে পরম একত্ববাদ প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আর যদি দ্বিতীয় উৎস নিজেই সৃষ্ট হয়, তাহলে আবার তার উৎসের প্রশ্ন আসে।
পৃথিবী এসেছে ➡️ নক্ষত্র থেকে
নক্ষত্র এসেছে ➡️ গ্যাস থেকে
গ্যাস এসেছে ➡️ মৌল থেকে
মৌল এসেছে ➡️ পরমাণু থেকে
পরমাণু এসেছে ➡️ মৌলিক কণা থেকে
মৌলিক কণা এসেছে ➡️ quantum field থেকে।
তাহলে প্রশ্ন: Quantum field কোথা থেকে?
যদি বলা হয় অন্য কোনো ক্ষেত্র থেকে, আবার প্রশ্ন: সেটি কোথা থেকে।
এভাবে প্রশ্নটি পিছনের দিকে যেতে থাকে। তখন দার্শনিক ভাবে বলা যায়— সৃষ্ট জগতের চূড়ান্ত ভিত্তি আল্লাহর বাইরে কোনো স্বাধীন সত্তা নয়।
যদি গ্রহ, নক্ষত্র, পানি, মাটি, মানুষ, ইলেকট্রন—সবই আল্লাহর অংশ না হয়, তাহলে এগুলোর মৌলিক উপাদান কোথা থেকে এলো? আর সেই উপাদানের চূড়ান্ত উৎস কী?
“বহুরূপ জগতের অন্তরালে একক পরম অস্তিত্ব; রূপ বদলায়, জগত বদলায়—কিন্তু পরম উৎস অবিনশ্বর।”
“বিশ্বজগতের বহুত্বের অন্তরালে রয়েছে একক পরম উৎস। আমরা যে পদার্থ, শক্তি, প্রাণ, নক্ষত্র, গ্রহ ও অণু-পরমাণুর বহুরূপতা দেখি, সেগুলো বিচ্ছিন্ন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্তিত্ব নয়; তারা একটি সুসংবদ্ধ মহাবিশ্বের পরস্পর-সম্পর্কিত রূপ।
প্রকৃতির দৃশ্যমান স্তরে সৃষ্টি ও বিনাশের পরিবর্তে রূপান্তর একটি মৌলিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনশীল রূপের অন্তরালে যে পরম, অনাদি ও অবিনশ্বর সত্তা—কুরআন তাঁকেই ‘আল-আউয়াল’ ও ‘আল-আখির’, প্রথম ও শেষ বলে নির্দেশ করে।
“তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ; তিনিই প্রকাশ্য এবং তিনিই অপ্রকাশ্য।” সূরা আল-হাদীদ ৫৭:৩
বহুরূপ জগতের অন্তরালে একক পরম উৎস; রূপ বদলায়, জগত বদলায়—কিন্তু পরম উৎস অবিনশ্বর।
রুপ বদলানোর ইংগীত দিয়ে আরো বলেনঃ
“আর যারা সৌভাগ্যবান, তারা থাকবে জান্নাতে; যতদিন আসমানসমূহ ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে,১১:১০৮
তার মানে কি? বর্তমান পৃথিবীকেই জান্নাত জাহান্নাম ভাবা যায়? যেহেতু আয়তে দাবী করে ” তারা থাকবে জান্নাতে; যতদিন আসমানসমূহ ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে”।
না বরং অন্যত্র তার উত্তরে বার্তা দেয়:
“যেদিন পৃথিবী অন্য পৃথিবীতে এবং আসমানসমূহ অন্য আসমানসমূহে পরিবর্তিত হবে…”১৪:৪৮
এবার আবারও প্রশ্ন আসে — যদি পৃথিবী অন্য পৃথিবীতে পরিবর্তিত হয়, তাহলে ১১:১০৭–১০৮-এর “আসমান ও জমিন” কোন পর্যায়ের আসমান ও জমিন?
কোরান এর কোন সুস্পষ্ট ধারনা জানায় না। তাই সেখানে কৌতুহলী হৃদয় নিরব থাকতে বাধ্য হয়।
আল্লাহর সৃষ্টিশীল কর্মকে আমরা যখন প্রকৃতির স্তরে দেখি, তখন সেখানে রূপান্তর, বিন্যাস ও পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা দেখতে পাই।
আবার থামিয়ে দেয় যখন বার্তা আসে প্রতিনিয়ত প্রতিক্ষন তিনি নতুন কিছু কর্মে ব্যাস্ত থাকেন।
“প্রতিদিন/প্রতিক্ষণ তিনি এক নতুন কর্মে/অবস্থায় আছেন।” ৫৫:২৯
সবশেষে আলোচনার সিদ্ধান্ত আমাকে এই বলে যে, كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَه
তাঁর সত্তা ছাড়া সবকিছুই ধ্বংসশীল।” ২৮:৮৮
তার অস্তিত্তই প্রকৃতি ও বিশ্ব ভ্রমান্ড, সকল আলমসমূহ।”
সৃষ্টির দৃশ্যমান প্রক্রিয়ায় রূপান্তর একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।”
আমরা মহাবিশ্বের বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন বস্তু নই; আমরা মহাবিশ্বেরই অংশ।
“এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ স্পষ্ট করেন, যাতে তোমরা চিন্তা কর।” ২:২৬৬
অর্থাৎ কুরআন শুধু পাঠ করার বিষয় নয়; কুরআন নিজেই তার আয়াত নিয়ে তাদাব্বুর ও চিন্তা করার আহ্বান জানাচ্ছে।
