আল্লাহর ভাষা — বাণীর অতীন্দ্রিয় উৎস।
ভাষা (اللّغة) হচ্ছে সৃষ্ট জগতে যোগাযোগের মাধ্যম, যা ধ্বনি, অক্ষর ও চিহ্ন দ্বারা গঠিত। অতএব, এটি সৃষ্টি (مخلوق) — যেমন মানুষ, ফেরেশতা বা জিনদের মধ্যকার যোগাযোগে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আল্লাহ সৃষ্ট নন — তিনি সময়, স্থান, রূপ, ধ্বনি ও অক্ষরের ঊর্ধ্বে।সুতরাং, আল্লাহর বাণী (كلام الله) — মানুষের ধ্বনিগত ভাষায় সীমাবদ্ধ নয়।
কুরআন বহুবার বলেছে: وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا “আল্লাহ মূসার সঙ্গে কথা বলেছেন — বাস্তব কথোপকথনের মাধ্যমে।” (সূরা নিসা ৪:১৬৪)
এখানে প্রশ্ন জাগে: আল্লাহ কোন ভাষায় কথা বলেছিলেন? মূসা (আ.) বনী ইসরাঈলের, অর্থাৎ ইবরানি (Hebrew) ভাষাভাষী ছিলেন। কিন্তু কুরআন কখনো বলে না যে “আল্লাহ ইবরানি ভাষায় কথা বললেন”; বরং বলে “কথা বললেন” (كَلَّمَ), যা ইঙ্গিত করে — বাণী ছিল শব্দের ঊর্ধ্বে, কিন্তু মূসা সেটি নিজের ভাষায় অনুধাবন করলেন।
প্রত্যেক নবীর প্রতি ওহি তাদের ভাষায় وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ “আমি প্রত্যেক রাসূলকে পাঠিয়েছি তার জাতির ভাষায়, যাতে সে তাদেরকে পরিষ্কারভাবে বুঝাতে পারে।” (সূরা ইব্রাহীম ১৪:৪)
এখানে মূল বিষয়টি হলো, আল্লাহর বাণী অবতীর্ণ হয় মানবের ভাষায়, কিন্তু তা আল্লাহর ভাষা নয়।অর্থাৎ, বাণীর উৎস আল্লাহর, কিন্তু তার রূপ প্রকাশিত হয় মানুষের ভাষায়।
কুরআনের আরবি — মানবীয় বাহক, কিন্তু ঐশী উৎস “আমি এটি নাযিল করেছি আরবি কুরআনরূপে, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।” (সূরা ইউসুফ ১২:২)
এই আয়াত স্পষ্ট করে:আল্লাহ কুরআনকে “আরবি ভাষায়” প্রকাশ করেছেন মানুষের বোঝার সুবিধার্থে।
কিন্তু আরবি ভাষা আল্লাহর নিজস্ব ভাষা নয় — এটি ওহির বাহক ভাষা মাত্র।
বিচার দিবসে আল্লাহর কথা — কুরআনের ভাষায় “সেদিন কোনো প্রাণ কথা বলবে না, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া।” (সূরা হুদ ১১:১০৫)
এখানেও “কথা” হবে, কিন্তু কোন ভাষায় — তা আল্লাহ বলেননি। তবে মানুষ বুঝতে পারবে, কারণ আল্লাহ প্রতিটি জাতির ভাষা জানেন। তখন আল্লাহ যেভাবে ইচ্ছা, প্রত্যেকে তার ভাষায় বুঝবে তাঁর বাণী।
কুরআনের ভাষা আরবি, কিন্তু আল্লাহর ভাষা অতীন্দ্রিয় (لامخلوق)। বিচার দিবসে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভাষায় বুঝতে পারবে আল্লাহরবাণী।
১) ٱلرَّحْمَـٰنُ (আর-রাহমানু) = পরম দয়ালু, অতি করুণাময়
২) عَلَّمَ ٱلْقُرْآنَ (আল্লামাল কুরআন) = তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন (জ্ঞান/বাণী/আদেশ)।
৩) خَلَقَ ٱلْإِنسَانَ (খালাকাল ইনসান) = তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে।
৪) عَلَّمَهُ ٱلْبَيَانَ ( আল্লামাহুল বয়ান) = তাকে শিক্ষা দিয়েছেন “বয়ান” — অর্থাৎ কথা বলার, প্রকাশ করার, বোধের ক্ষমতা।
(আল্লামা হুল বয়ান) عَلَّمَهُ البَيَانَ — মানুষকে আল্লাহ দিয়েছেন প্রকাশের ভাষা; এই “বয়ান” মানে শুধু কথা বলা নয় — চিন্তা প্রকাশ, যুক্তি গঠন, সত্য অনুধাবনের ক্ষমতা।

2 replies on “আল্লাহর ভাষা”
ভাই অনেক সুন্দর ভাবে যুক্তিসংগত ড্যাটার মাধ্যমে বুঝিয়েছেন। ভালো লাগলো।
একটা শব্দে আমার একটু দ্বিধা রয়েছে
“বয়ান”- না ” বায়ান” হবে?
ধন্যবাদ। আরবী উচ্চারন বায়ান – বয়ান