আল্লাহর আইন নাকি বুখারীর আইন — কুরআনের আলোকে ইসলামি রাজনীতির মুখোশ।
আজকের পৃথিবীতে অনেক দল ও সংগঠন নিজেদের মুখে ঘোষণা করে — “আমরা আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে চাই।”
তারা রাজনীতিতে আসে, ক্ষমতার দাবি তোলে, পতাকায় ‘কালেমা’ লিখে, জনতাকে ধর্মীয় আবেগে আহ্বান জানায়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে — তারা আসলে কোন আইন প্রতিষ্ঠা করতে চায়? আল্লাহর কিতাবের আইন, না মানুষের বানানো শরীয়াহ?
যে সব দল “আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা”র কথা বলে কিন্তু কার্যত “বুখারীর বা হাদীসগ্রন্থের মানবরচিত আইন”কেই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিধান হিসেবে চালায়, তারা কারা হতে পারে? কুরআনের দৃষ্টিতে তাদের অবস্থান কী, এবং বাস্তব রাজনীতিতে এ ধরনের দল কারা?
এটি দুটি দিক থেকে দেখা যায়ঃ-
১) কুরআন এ ধরনের লোকদের কয়েকটি নামে উল্লেখ করেছে, যেমনঃ “যারা বলে আমরা আল্লাহর হুকুম মানি”, অথচ বাস্তবে অন্য আইন অনুসরণ করে।
(ক) তুমি কি দেখনি তাদের, যারা দাবি করে যে তারা তোমার উপর ও তোমার পূর্বে নাযিল কৃত গ্রন্থে ঈমান এনেছে, অথচ তারা চায় বিচার হোক তাগুত (অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত অন্য আইনের) দ্বারা?” (সূরা আন-নিসা ৪:৬০)
অর্থ: এরা মুখে বলে “আমরা আল্লাহর আইন মানি”, কিন্তু তাদের বিচারব্যবস্থা, নীতি, সংবিধান সবই মানুষ-প্রণীত উৎস থেকে নেয়।
(খ) যারা আল্লাহর কিতাবের কিছু অংশ মানে, কিছু অস্বীকার করে”: أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ তোমরা কি কিতাবের এক অংশে বিশ্বাস করো, আর অপর অংশ অস্বীকার করো? (২:৮৫)
অর্থ: যারা কুরআনকে মূল উৎস হিসেবে গ্রহণ না করে, বরং হাদীস, ফিকহ, মাজহাব বা ইমামদের মতামতকেই কিতাবের সমপর্যায়ে বসায় — তারা বাস্তবে কুরআনকে ভাগ করে নিচ্ছে।
২) বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেঃ “ওরা বলে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কিন্তু বাস্তবে বুখারীর আইন লালন করে।”
তথাকথিত “ইসলামী রাজনৈতিক দল” — তারা সংবিধানিকভাবে দাবি করে “আমরা ইসলামি শাসন চাই”, কিন্তু তাদের “আইনের উৎস” হিসেবে গ্রহণ করে বুখারী, মুসলিম, ফিকহ, হানাফি-শাফেয়ি মতবাদ, অর্থাৎ কুরআন নয়, বরং ইমাম ও মুহাদ্দিসদের ব্যাখ্যা।
কুরআনের ভাষায়, এরা “مُشْرِكُونَ” (শিরককারী) দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে কারণ তারা আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্যের বিধানকে শরীয়াহ হিসেবে গ্রহণ করে।
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ বিধান করার অধিকার একমাত্র আল্লাহরই।( ১২:৪০)
কিন্তু এরা এই নীতিকে মুখে বলে, বাস্তবে পালন করে না।
৩) কুরআন ভিত্তিক মূল্যায়নঃ
“আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা” মানে কুরআনের বিধান প্রতিষ্ঠা। “হাদীসের বিধান” প্রতিষ্ঠা মানে মানুষের মতামতকে আল্লাহর সমকক্ষ করা।
সুতরাং যেসব রাজনৈতিক দল বা সংগঠন কুরআন নয়, বরং ইমামদের ব্যাখ্যা, ফিকহ বা বুখারীর হাদীসকে রাষ্ট্রীয় আইন করতে চায় — তারা মূলত “আল্লাহর আইন” নয়, “মানব রচিত ইসলামি আইন” প্রতিষ্ঠা করছে।
#কুরআনের দৃষ্টিতে, এমন দল বা আন্দোলন “আল্লাহর শাসন” নয়, বরং “তাগুতের শাসন” প্রতিষ্ঠা করছে — যদিও তারা ধর্মীয় পোশাকে তা উপস্থাপন করে।
কোন জাতি যদি আল্লাহর আইন মেনে চলতে চায়, তবে তাদের উৎস হতে হবে কুরআন যেখানে আল্লাহ নিজে সবকিছুর মূলনীতি, বিধান ও পরিচালনার নীতি নির্ধারণ করেছেন।
কিন্তু বাস্তবে যা দেখা যায় — বেশিরভাগ তথাকথিত “ইসলামী দল” আল্লাহর আইন বলতে বোঝে ইমামদের ব্যাখ্যা, বুখারীর হাদীস, ফিকহ, এবং মাযহাবভিত্তিক শরীয়াহ।
তারা কুরআনকে নয়, বরং মক্কা-মদিনার ২০০ বছর পর রচিত গ্রন্থগুলোকেই আইনের উৎস বানায়।
তারা বলে — “আল্লাহর আইন” কিন্তু লিখিত সংবিধানে বসায় “ইমামদের মতবাদ”।
তারা চিৎকার করে “শরীয়াহ রাষ্ট্র”, কিন্তু আসলে প্রতিষ্ঠা করে “ইমামী রাষ্ট্র”।
আল্লাহ তাআলা বলেন —“তুমি কি দেখনি তাদের, যারা বলে ‘আমরা ঈমান এনেছি’, অথচ তারা বিচার চায় তাগুতের (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের) কাছে?” (নিসা ৪:৬০)
এই আয়াত আজ হুবহু বাস্তবে ফিরে এসেছে। কারণ যারা মুখে বলে “আমরা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করব”,তারা আইন প্রণয়নের সময় মানুষের রচিত শরীয়াহ বই খুলে বসে, আল্লাহর কিতাব নয়।
যখন কুরআনভিত্তিক ইসলাম হারিয়ে যায়, তখন ধর্মের নামে নতুন নতুন দল গড়ে ওঠে। প্রতিটি দল দাবি করে — “আমরা সত্যের অনুসারী।”
কিন্তু কুরআনের ভাষায় —
“প্রতিটি দল তাদের নিজস্ব মতবাদ নিয়েই সন্তুষ্ট।” সূরা রূম ৩০:৩২
অর্থাৎ, ইসলাম হয়ে যায় দলীয় মতবাদের হাতিয়ার। কেউ বুখারীর ব্যাখ্যা ধরে, কেউ হানাফির ফিকহ ধরে, কেউ রাজনৈতিক ইসলাম বানিয়ে ফেলে যেখানে কুরআন কেবল একটি প্রতীকী ব্যানার।
কুরআন বলে — الَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ
যারা তাদের সালাতে স্থায়ী থাকে। ( ৭০:২৩)
এই সালাত কেবল নামাজ নয়, এটি আল্লাহর প্রতি অবিরাম আত্মসমর্পণ। যে আত্মসমর্পণে অন্য কারো আইন, মত বা ব্যাখ্যার স্থান নেই। প্রকৃত ইসলামী সমাজ সেই সমাজ,যেখানে বিধান শুধু কুরআন থেকে,আর শাসন শুধু আল্লাহর নামে।
সব শেষে বলবোঃ
আজ “আল্লাহর আইন” প্রতিষ্ঠার দাবিদার দলগুলো আসলে “আল্লাহর আইন” নয়, মানুষের ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করছে। তারা “বুখারীর ইসলাম” প্রতিষ্ঠা করছে, “কুরআনের ইসলাম” নয়।
