“প্রত্যেকে যার যার মত ও পথ নিয়ে উৎফুল্ল; মনে করে এটিই সঠিক”
১. যারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে পরিণত হয়েছে—প্রত্যেক দলই তাদের নিজেদের কাছে যা আছে, তা নিয়ে উৎফুল্ল।(৩০:৩২)
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়:
فَرَّقُوا دِينَهُمْ — তারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে।
شِيَعًا — বিভিন্ন দল/সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়েছে।
كُلُّ حِزْبٍ — প্রত্যেক দল।
بِمَا لَدَيْهِمْ — তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে।
فَرِحُونَ — তারা আনন্দিত/উৎফুল্ল।
২.কিন্তু তারা তাদের বিষয়কে নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত করেছে; প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে, তা নিয়ে উৎফুল্ল।(২৩:৫৩)
এখানেও একই বাক্য এসেছে:
كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ
“প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল।”
৩. সূরা বাকারা ২:১১৩ এখানে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর “আমরাই সঠিক” ধরনের দাবির কথা এসেছে:
“ইহুদিরা বলল, ‘খ্রিস্টানদের কোনো ভিত্তি নেই’; আর খ্রিস্টানরা বলল, ‘ইহুদিদের কোনো ভিত্তি নেই’…”(২:১১৩)
অর্থাৎ, প্রত্যেক পক্ষ নিজের অবস্থানকে সঠিক এবং অপর পক্ষকে ভুল মনে করছিল।
৪. সূরা রূম — ৩০:৩০–৩২-এর মূল শিক্ষা বিশেষ করে ৩০:৩১–৩২ পাশাপাশি পড়লে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়:
“তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনশীল হও, তাঁকে ভয়-সচেতনতা অবলম্বন করো, সংযোগ প্রতিষ্ঠা করো এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না—যারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে পরিণত হয়েছে; প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল।”
একটি গুরুত্বপূর্ণ কুরআনিক পার্থক্য কুরআন এখানে শুধু ভিন্ন মত থাকা-কে লক্ষ্য করছে না; বরং দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দলাদলি করা এবং নিজের দলের কাছে থাকা বিষয় নিয়েই আত্মতুষ্ট হয়ে থাকা—এটিকে সতর্ক করেছে। এ বিষয়ের সঙ্গে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত হলো:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ…
“অতএব, আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না নিজেদের পারস্পরিক বিরোধের ক্ষেত্রে আপনাকে বিচারক মানে…” সূরা নিসা ৪:৬৫
মানুষের স্বভাবের একটি দিক হলো—সে নিজের বিশ্বাস, মত ও পথকে সত্য মনে করতে পারে এবং সেই বিশ্বাসের প্রতি গভীরভাবে সন্তুষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু কুরআন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখে:
সত্য কি মানুষের দলগত পরিচয়, সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা নিজের বিশ্বাসের প্রতি আত্মতুষ্টির ওপর নির্ভরশীল—নাকি সত্যের একটি নিরপেক্ষ মানদণ্ড রয়েছে?
কুরআনের আয়াতগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, আল্লাহ মানুষকে অন্ধ দলীয় আনুগত্য থেকে বের হয়ে ওহি, জ্ঞান, প্রমাণ ও সত্যের অনুসরণ করতে আহ্বান করেছেন।
১. প্রত্যেক দলই নিজের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল আল্লাহ বলেন:
“যারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে পরিণত হয়েছে; প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল।”
সূরা আর-রূম ৩০:৩২ “প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল।”
অর্থাৎ, নিজের কাছে যা আছে সেটি নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়া—নিজে নিজে সত্য হওয়ার প্রমাণ নয়।
২. একই সতর্কবাণী সূরা মুমিনূনেও আল্লাহ বলেন: “কিন্তু তারা তাদের বিষয়কে নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত করেছে; প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল।” সূরা আল-মুমিনূন ২৩:৫৩
এখানে زُبُرًا (যুবারান) শব্দটি খণ্ড/বিভাগ বা পৃথক অংশের ধারণা প্রকাশ করে। অর্থাৎ মূল ঐক্যের পরিবর্তে মানুষ যখন নিজেদের বিষয়কে বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত করে, তখন প্রত্যেক গোষ্ঠী নিজের অংশটিকেই সম্পূর্ণ সত্য মনে করার প্রবণতায় পড়ে যেতে পারে।
৩. শুধু “আমরাই সঠিক”—এ দাবি সত্যের প্রমাণ নয় কুরআন এমন একটি দৃশ্য তুলে ধরে যেখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করছিল।
“ইহুদিরা বলল, ‘খ্রিস্টানরা কোনো কিছুর ওপর নেই’; আর খ্রিস্টানরা বলল, ‘ইহুদিরা কোনো কিছুর ওপর নেই।’” সূরা আল-বাকারা ২:১১৩
এরপর কুরআন বলে:
كَذَٰلِكَ قَالَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ مِثْلَ قَوْلِهِمْ
“যারা জ্ঞান রাখে না, তারাও অনুরূপ কথা বলেছে।” অতএব, কোনো পক্ষের দৃঢ় দাবি বা আত্মবিশ্বাসই সত্যের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
৪. আল্লাহর কাছে সত্যের মানদণ্ড কী? কুরআন বলে:
فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ
সত্যের পর ভ্রান্তি ছাড়া আর কী আছে?(১০:৩২)
এখানে الْحَقّ (আল-হক্ক) হলো সত্য। অর্থাৎ প্রশ্নটি হওয়া উচিত: “আমাদের দল কী বলে?” এর চেয়ে বড় প্রশ্ন: “আল্লাহ কী বলেছেন?”
৫. অনুমান সত্যের বিকল্প নয় আল্লাহ বলেন: إِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا
“নিশ্চয়ই অনুমান সত্যের কোনো কাজে আসে না।” সূরা ইউনুস ১০:৩৬
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। মানুষ কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রবলভাবে বিশ্বাস করতে পারে। কিন্তু বিশ্বাসের দৃঢ়তা হল সত্যের নিশ্চয়তা। তাই কুরআন মানুষকে জিজ্ঞাসা করতে শেখায়—প্রমাণ কোথায়?
৬. যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করা যাবে না আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ
“যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।” সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৬
অর্থাৎ কোনো মতকে শুধু এজন্য গ্রহণ করা যাবে না যে— সবাই তা মানে, পূর্বপুরুষেরা তা মানতেন, নিজের দল তা মানে, নিজের পরিচিত আলেম বা নেতা তা বলেছেন, অথবা দীর্ঘদিন ধরে মানুষ তা অনুসরণ করে আসছে। কুরআনের নীতি হলো: জ্ঞান ছাড়া অনুসরণ নয়।
৭. বরং উত্তম কথা শুনে তার শ্রেষ্ঠটি অনুসরণ করতে হবে আল্লাহ বলেন:
“অতএব আমার বান্দাদের সুসংবাদ দিন—যারা কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং তার মধ্যে উত্তমটির অনুসরণ করে।” সূরা আয-যুমার ৩৯:১৭–১৮
এখানে একটি অসাধারণ নীতি পাওয়া যায়: শুনবে → যাচাই করবে → উত্তমটি অনুসরণ করবে। অর্থাৎ সত্যের অনুসন্ধানী মানুষ নিজের মতের কাছে বন্দী থাকবে না।
৮. মতভেদ হলে ফিরে যেতে হবে আল্লাহর দিকে আল্লাহ বলেন “কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ হলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। (৪:৫৯)
এখানে কুরআনের একটি মৌলিক পদ্ধতি পাওয়া যায়: মতভেদ ➡️আবেগ নয় ➡️ দলীয় পক্ষপাত নয়➡️ আল্লাহর নির্দেশের দিকে প্রত্যাবর্তন।
৯. মতভেদের মধ্যেও সত্য একটিই আল্লাহ বলেন: “তোমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না যারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে পরিণত হয়েছে।” সূরা আর-রূম ৩০:৩১–৩২
এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো—আল্লাহ প্রথমে বলেন: أَقِيمُوا الصَّلَاةَ “সংযোগ প্রতিষ্ঠা করো।”
তারপর বলেন: وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ এবং এরপর দলাদলির কথা উল্লেখ করেন।
অর্থাৎ কুরআনের আলোচনায় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ও সত্যের প্রতি প্রত্যাবর্তন এবং দলাদলি থেকে মুক্ত থাকা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
১০. আল্লাহর দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড না করার নির্দেশ আল্লাহ বলেন:
أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ
“দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং এতে বিভক্ত হয়ো না।” সূরা আশ-শূরা ৪২:১৩
এখানে: وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ অর্থাৎ “এতে বিভক্ত হয়ো না।” এটি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মূল দ্বীনের দিকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান।
১১. মতভেদ কখন সৃষ্টি হলো? একই আয়াতের পরবর্তী অংশে আল্লাহ বলেন:
وَمَا تَفَرَّقُوا إِلَّا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ
“তাদের কাছে জ্ঞান আসার পরও তারা কেবল নিজেদের পারস্পরিক বিদ্বেষ/অন্যায় প্রতিযোগিতার কারণে বিভক্ত হয়েছে।” সূরা আশ-শূরা ৪২:১৪
এখানে একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে: সব মতভেদের কারণ অজ্ঞতা নয়। কখনো জ্ঞান থাকার পরও স্বার্থ, অহংকার, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পারস্পরিক বিরোধ মানুষকে বিভক্ত করতে পারে।
১২. দল বড় হলেই সত্য প্রমাণিত হয় না কুরআন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যাপারেও সতর্ক করেছে:
“তুমি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ করো, তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে; তারা কেবল অনুমানের অনুসরণ করে।” (৬:১১৬)
অতএব একটি মতের অনুসারী কোটি কোটি মানুষ হলেও সেটিই সত্য—এমন কোনো কুরআনিক নীতি নেই।
১৩. আবার সংখ্যালঘু হলেই মিথ্যা এটিও কুরআনিক নীতি নয়। কুরআন সত্য নির্ধারণের জন্য সংখ্যা নির্ধারণ করেনি। সত্যের মানদণ্ড হলো: আল্লাহর নির্দেশ, জ্ঞান,প্রমাণ,সত্য, ন্যায়, এবং ওহির প্রতি আনুগত্য। তাই একজন মানুষ একা হলেও সত্যের অনুসারী হতে পারেন, আবার বিশাল জনগোষ্ঠীও ভুলের ওপর থাকতে পারে।
১৪. কুরআন দলীয় অহংকারের পরিবর্তে ঐক্যের আহ্বান জানায়।
আল্লাহ বলেন: وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
“তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।” সূরা আলে ইমরান ৩:১০৩
এখানে ঐক্যের ভিত্তি কী? আল্লাহর রজ্জু। নিজস্ব দল নয়। নিজস্ব পরিচয় নয়। নিজস্ব অহংকার নয়।
১৫. দলাদলির বিষয়ে সবচেয়ে কঠোর সতর্কবাণীগুলোর একটি।
আল্লাহ বলেন: إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ
“নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে পরিণত হয়েছে—তাদের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। সূরা আল-আনআম ৬:১৫৯
১. অনুমান থেকে সাবধান থাকুন “إِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا” অনুমান সত্যের বিকল্প নয়। ১০:৩৬
২. মতভেদ হলে আল্লাহর দিকে ফিরে যান “فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ” তা আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দাও। ৪:৫৯
৩. নিজের দলের প্রতি আত্মতুষ্টিকে সত্যের প্রমাণ মনে করবেন না “كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ” প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল। ৩০:৩২; ২৩:৫৩
৪. সংখ্যাগরিষ্ঠতার মোহে পড়বেন না “وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ…” পৃথিবীর অধিকাংশের অনুসরণ করলেও তারা পথভ্রষ্ট করতে পারে। ৬:১১৬
কুরআনের দৃষ্টিতে “আমি যে মত মানি, তাই সত্য”—এমন আত্মতুষ্টি সত্যের প্রমাণ নয়। একইভাবে: “আমার দলই সত্য” “আমাদের পূর্বপুরুষের পথই একমাত্র সত্য” “আমাদের অনুসারী বেশি, তাই আমরা সত্য” “আমাদের আলেম বলেছেন, তাই আর যাচাই প্রয়োজন নেই” এগুলোর কোনোটিকেই কুরআন সত্যের স্বয়ংসম্পূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি।
বরং কুরআন মানুষকে নিজের অবস্থান যাচাই করতে আহ্বান করে।
كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ
“প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল।” (৩০:৩২)
সুতরাং একজন সত্যসন্ধানীর প্রশ্ন হওয়া উচিতঃ “আমি কোন দলের?”—এর আগে
“আমি যে মতটি ধারণ করছি, কুরআনের প্রমাণে সেটি কতটা সত্য?”
এবং আরও গভীর প্রশ্ন:
“আমি কি সত্যকে অনুসরণ করছি, নাকি সত্যকে আমার নিজের মতের সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছি?”
কুরআনের দৃষ্টিতে সত্যের অনুসন্ধান এখান থেকেই শুরু হয়।
