কুরআন পূর্ণাঙ্গ হলে ফরজ বিধানের জন্য অন্য গ্রন্থের প্রয়োজন কেন?
এই আলোচনার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি, মাযহাব বা সম্প্রদায়ের সমালোচনা নয়। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর কিতাব আল-কুরআনকে তার নিজের দাবির আলোকে বোঝা।
কুরআন নিজের সম্পর্কে কী দাবি করেছে?
১) এটি কি পূর্ণাঙ্গ?
২) এটি কি দ্বীনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা?
৩)আল্লাহ মানুষের জন্য যা ফরজ করেছেন, তা কি কুরআনেই সম্পূর্ণভাবে বর্ণিত?
৪) নাকি আল্লাহর ফরজ জানার জন্য কুরআনের পাশাপাশি আরও কিছু গ্রন্থ অপরিহার্য?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কুরআন থেকেই অনুসন্ধান করাই এই গবেষণার লক্ষ্য।
কুরআনের নিজের দাবি
১) দ্বীন পূর্ণাঙ্গঃ “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (আল-মায়িদাহ ৫:৩)
২) কিতাবে কিছুই বাদ রাখা হয়নিঃ
“আমি কিতাবে কোনো কিছুই বাদ রাখিনি।”(সূরা আল-আন‘আম ৬:৩৮)
যদি আল্লাহর ফরজ কোনো বিষয় কিতাবে উল্লেখ না থাকে, তবে “কোনো কিছুই বাদ রাখা হয়নি”—এই ঘোষণার অর্থ কী?
৩) প্রত্যেক বিষয়ের ব্যাখ্যাঃ
“আমি তোমার উপর এই কিতাব নাযিল করেছি প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা, হিদায়াত, রহমত এবং মুসলিমদের জন্য সুসংবাদ হিসেবে।”(সূরাআন-নাহল ১৬:৮৯)
যদি কুরআন প্রত্যেক বিষয়ের ব্যাখ্যা হয়, তবে আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ বিধান কি এর বাইরে থাকতে পারে?
প্রশ্ন আসতে পারে আল্লাহ মানুষের উপর যা ফরজ করেছেন, তার সম্পূর্ণ ভিত্তি কি কুরআনেই বিদ্যমান? নাকি— আল্লাহর ফরজ জানতে হলে কুরআনের পাশাপাশি হাদিস, ফিকহ, উসূলুল-ফিকহ বা অন্য কোনো গ্রন্থকে অপরিহার্যভাবে গ্রহণ করতে হবে?
আমরা কারও মতামতকে সত্য ধরে কুরআনকে ব্যাখ্যা করব না।
বরং কুরআনের বক্তব্যকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে দেখব—
কুরআন নিজে কী বলছে। কুরআন কী দাবি করছে। এবং প্রচলিত ধারণাগুলো সেই দাবির সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আমার মূলনীতি হবে— আল্লাহর কিতাবই হবে বিচারক; অন্য সব বক্তব্য তার আলোকে মূল্যায়িত হবে।
১) “ফরজ” কাকে বলে?
২) ফরজ নির্ধারণের অধিকার কার?
৩) রাসূল সা: কি কুরআনের বাইরে স্বাধীনভাবে নতুন ফরজ নির্ধারণ করেছেন?
কুরআনের আলোকে “ওহী”, “রাসূলের অনুসরণ” এবং “আল্লাহর বিধান”—এই তিনটির সম্পর্ক কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কুরআনের আয়াতের ভিত্তিতে আলোচনা করব।
পর্ব–১: ফরজ নির্ধারণের অধিকার কার?
একজন মুসলিমের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আল্লাহ কোন কাজকে ফরজ করেছেন এবং কোন কাজকে ফরজ করেননি।
কারণ ফরজ এমন একটি বিধান, যার পালন আল্লাহ বাধ্যতামূলক করেছেন।
তাই প্রথম প্রশ্ন: ফরজ নির্ধারণের অধিকার কার? কুরআনের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট। আইন প্রণয়নের অধিকার একমাত্র আল্লাহর।
“হুকুম (বিধান) দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তিনি ছাড়া কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল দ্বীন।” (সূরা ইউসুফ ১২:৪০)
আরও বলেন: “তিনি তাঁর বিধানে কাউকে শরিক করেন না।” (সূরা আল-কাহফ ১৮:২৬)
অতএব, কুরআনের নীতি হলো— ফরজ, হারাম, হালাল নির্ধারণের চূড়ান্ত অধিকার একমাত্র আল্লাহর।
পর্ব-২. রাসূল সা: কি নিজের পক্ষ থেকে বিধান দিতেন?
আল্লাহ রাসূলকে বলতে নির্দেশ দেন: “বলুন, আমি কেবল সেই ওহীরই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি নাযিল করা হয়।” (সূরা আল-আনআম ৬:৫০)
আরও বলেন: “বলুন, আমার নিজের পক্ষ থেকে এটিকে পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি কেবল সেই ওহীর অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি নাযিল করা হয়।” (সূরা ইউনুস ১০:১৫)
আরও বলেন: “আমি তো কেবল আমার প্রতি যা ওহী করা হয় তারই অনুসরণ করি।” (সূরা আল-আহকাফ ৪৬:৯)
এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, রাসূল সা: নিজেকে স্বাধীন আইন প্রণেতা হিসেবে নয়, বরং ওহীর অনুসারী ও প্রচারক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
পর্ব- ৩ ফরজ আরোপের ক্ষমতা কার?
কুরআনে বহু স্থানে আল্লাহ নিজেই বলেন— আল্লাহ তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করেছেন। (২:১৮৩)
আল্লাহ তোমাদের উপর হজ্জ ফরজ করেছেন। (৩:৯৭)
সালাত মুমিনদের উপর নির্ধারিত (মাওকূত) বিধান। (৪:১০৩)
অর্থাৎ, ফরজ ঘোষণা করেন একমাত্র আল্লাহ।
প্রশ্ন হলো: যদি আল্লাহ কোনো বিষয়কে ফরজ করেন, তবে সেই ফরজের ঘোষণা কোথায় থাকবে?
স্বাভাবিক উত্তর হবে— আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবেই।
এখানে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছি না।
আমরা শুধু একটি প্রশ্ন রাখছি— যদি কোনো কাজকে “আল্লাহর ফরজ” বলা হয়, অথচ তার ফরজ হওয়ার সুস্পষ্ট ভিত্তি কুরআনে পাওয়া না যায়, তাহলে সেই ফরজের উৎস কী?
এবার আসি কুরআন কি সত্যিই “প্রত্যেক বিষয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা”?
“তিবইয়ানান লিকুল্লি শাই'” (১৬:৮৯)-এর অর্থ কী? “কোনো কিছু বাদ রাখিনি” (৬:৩৮)-এর অর্থ কী? “দ্বীন পূর্ণাঙ্গ” (৫:৩)-এর অর্থ কী?
এই তিনটি আয়াতের আলোকে ফরজ বিধানের অবস্থান কী? সুস্পষ্ট হয়ে যায় ফরজ বিধানের মালিক একমাত্র আল্লাহ এবং তার উৎস একমাত্র কোরান।
