Categories
Blog

পৃথিবীতে আসার আগে

 

মানুষ পৃথিবীতে আসার আগে কী অবস্থায় ছিল? জন্মের আগে মানুষ কোথায় ছিল? তখন জীবন্ত না  মৃত কোন অস্তিত্বে ছিল? 

এই দুই বিষয়কে একসঙ্গে অনুসন্ধান করলে, ৭:১৭২ আয়াতটি কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে।

“আর যখন তোমার রব বনি আদমের পৃষ্ঠদেশসমূহ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে তাদের সাক্ষী করলেন—‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’ (৭:১৭২)

আয়াতটি কোনো স্থান বা জগতের নাম বলেনি।

এটি বলেনি: “তারা জান্নাতে ছিল।” এটিও বলেনি: “তারা পৃথিবীর বাইরে কোনো আত্মার জগতে ছিল।” আবার এটাও বলেনি: “এটি শুধু রূপক।”

কুরআনের নিশ্চিত বক্তব্য হলো: বনি আদমের সঙ্গে তাদের রবের একটি সাক্ষ্য/স্বীকৃতির ঘটনা আছে।

কিন্তু সেই ঘটনার স্থান, সময় ও অস্তিত্বের ধরন সম্পর্কে অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া কুরআনের সরাসরি বক্তব্যের বাইরে চলে যায়।

পরের বাক্যটি আসলে এই সাক্ষ্যের উদ্দেশ্য বলে দেয় “যাতে তোমরা কিয়ামতের দিন বলতে না পারো—‘আমরা তো এ বিষয়ে অজ্ঞ ছিলাম।’  (৭:১৭২)

তার পরের আয়াত আরও পরিষ্কার করে বলেঃ “অথবা তোমরা যেন না বলো ‘আমাদের পূর্বপুরুষরাই তো আগে শিরক করেছিল, আর আমরা তো তাদের পরবর্তী বংশধর ছিলাম; তাহলে কি তুমি আমাদেরকে বাতিলকারীদের কাজের কারণে ধ্বংস করবে? (৭:১৭৩)

প্রশ্ন আসে তাহলে পৃথিবীতে জন্মের আগে মানুষের “অবস্থা” কী ছিল?

কুরআন বিভিন্ন আয়াতে মানুষের অস্তিত্বের বিভিন্ন পর্যায় উল্লেখ করেছে।

পর্যায় ১  মানুষ তখন উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। 

মানুষের ওপর কি এমন এক সময় অতিবাহিত হয়নি যখন সে উল্লেখযোগ্য কোনো বস্তুই ছিল না? (৭৬:১)

পর্যায় ২ — পৃথিবীজাত সৃষ্টির সূচনাঃ

“তিনি মানুষের সৃষ্টি শুরু করেছেন মাটি থেকে।” (৩২:৭)

পর্যায় ৩ — প্রজনন/গর্ভধারণঃ

“অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেছেন তুচ্ছ তরলের নির্যাস থেকে।” (৩২:৮)

পর্যায় ৪ — মাতৃগর্ভঃ 

“তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের গর্ভে এক সৃষ্টির পর আরেক সৃষ্টি করেন। (৩৯:৬)

অতএব কুরআন মানুষের দৃশ্যমান সৃষ্টির একটি ধারাবাহিকতা দেখায়। কিন্তু ৭:১৭২ এই ধারাবাহিকতার মধ্যে একটি বিশেষ প্রশ্ন তৈরি করে।

কুরআন একদিকে বলে: মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি শুরু। ( ৩২:৭)

⬇️

তারপর: বংশধরদের তরল থেকে সৃষ্টি। (৩২:৮)

⬇️ তারপর: মাতৃগর্ভে সৃষ্টি। (৩৯:৬)

অন্যদিকে ৭:১৭২ বলে: بَنِي آدَمَ — বনি আদমের কাছ থেকে তাদের বংশধরদের বের করা এবং সাক্ষ্য গ্রহণ।

কিন্তু একটি রহস্য এখনো থেকে যায়, ৭:১৭২-এর সেই সাক্ষ্যের মুহূর্তে প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত আত্মসচেতনতা কী ধরনের ছিল।”

মানুষ পৃথিবীতে আসার আগে তার সম্পর্কে কুরআন থেকে যতটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়: ১. মানুষ এমন এক সময় ছিল যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না — ৭৬:১। ২. মানবসৃষ্টির সূচনা মাটি থেকে — ৩২:৭। ৩. বংশধর সৃষ্টি হয়েছে তরল থেকে — ৩২:৮। ৪. মাতৃগর্ভে তার সৃষ্টি পর্যায়ক্রমে হয়েছে — ৩৯:৬। ৫. বনি আদমের সঙ্গে রবের একটি সাক্ষ্য/স্বীকৃতির ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে — ৭:১৭২। ৬. সেই সাক্ষ্যের উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের দিন অজ্ঞতার অজুহাত যেন না থাকে — ৭:১৭২। ৭. পূর্বপুরুষের পাপের দায় উত্তরাধিকারসূত্রে বহন করা যাবে না — ৭:১৭৩, ৬:১৬৪। ৮. মানুষের নিজের অর্জনই তার দায়ের ভিত্তি ৫৩:৩৮–৩৯

আসল প্রশ্ন আরও কঠিন: পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার আগের অবস্থাটা কী ছিল? ৭:১৭২-এ যদি মানুষকে জিজ্ঞেস করা হয়ে থাকে “আমি কি তোমাদের রব নই?”, তাহলে সেই মানুষ কারা? তারা কি তখন সচেতন ছিল? 

১. প্রথমে একটি ভুল ধারণা বাদ দিতে হবে “আদমের ভুলের শাস্তি হিসেবে প্রত্যেক মানুষ পৃথিবীতে জন্মেছে”—কুরআন এটি বলে না। বরং আদমের পৃথিবীতে আসার আগেই আল্লাহ ঘোষণা করেছিলেন: “আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা স্থাপন করতে যাচ্ছি।” (২:৩০)

এটি আদমের নিষেধ ভঙ্গের আগের কথা। অতএব পৃথিবীতে মানুষের আগমন আল্লাহর পরিকল্পনার মধ্যেই ছিল।

এখন প্রশ্ন: তারা কি পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার আগের কোনো অস্তিত্বে ছিল? কুরআন “তারা আত্মার জগতে ছিল”—এই ভাষা ব্যবহার করেনি। কুরআন এমন একটি পূর্ব-অবস্থার কথা বলছে যেখানে বনি আদমের সঙ্গে রবের সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; কিন্তু সেই অবস্থার প্রকৃতি ও স্থান কুরআন নির্দিষ্ট করেনি।

এখনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: তারা কি তখন “জ্ঞানসম্পন্ন” ছিল?

আয়াতের ভাষা লক্ষ্য করুন: “তাদের নিজেদের সম্পর্কে তাদের সাক্ষী করলেন।” তারপর: “আমি কি তোমাদের রব নই?” উত্তর: “তারা বলল, অবশ্যই।” এখানে প্রশ্ন–উত্তর–সাক্ষ্য আছে।

অতএব অন্তত আয়াতের বর্ণনার মধ্যে এমন একটি সচেতন স্বীকৃতি রয়েছে—এ কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা কঠিন।

কিন্তু এই সচেতনতার প্রকৃতি কী ছিল? কুরআন তা ব্যাখ্যা করেনি। এখানেই আমাদের থামতে হবে।

পরবর্তি আলোচনার জন্য ২ পর্বঃ

By Ekramul hoq

I am A.K.M Ekramul hoq MA.LLB. Rtd Bank Manager & PO of Agrani Bank Ltd. I am interested writing and reading. Lives in Bangladesh, District Jamalpur.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

``` }