Categories
Blog

পবিত্রতা কি

 

পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা

কুরআনের আলোকে

“পবিত্রতা” শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে সাধারণত অযু, গোসল, শরীর ধোয়া, পোশাক পরিষ্কার করা কিংবা অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হওয়ার বিষয়টি আসে। কিন্তু কুরআনের আয়াতগুলো গভীরভাবে পাশাপাশি পাঠ করলে দেখা যায়, পবিত্রতার ধারণা কেবল বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

কুরআনে পবিত্রতা কখনো শরীরের সঙ্গে, কখনো পোশাক ও স্থান-এর সঙ্গে, কখনো খাদ্য ও জীবনযাপনের সঙ্গে, আবার কখনো মানুষের অন্তর, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছে।

কুরআনে “পবিত্রতা” বলতে কী বোঝায়?

কুরআনের আয়াতগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, পবিত্রতা শুধু শরীর পরিষ্কার করার বিষয় নয়। প্রসঙ্গভেদে এর কয়েকটি স্তর রয়েছে।

ক. শারীরিক ও আনুষ্ঠানিক পবিত্রতাঃ ওজু, গোসল, পানি এবং অপবিত্র অবস্থা থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার সঙ্গে সম্পর্কিত।

আল্লাহ বলেন, তিনি মানুষকে কষ্টে ফেলতে চান না; বরং তাদের পবিত্র করতে চান। (৫:৬)

সূরা আল-আনফাল ৮:১১ বৃষ্টি দ্বারা আল্লাহ মানুষকে পবিত্র করার কথা বলেছেন।

সূরা আল-বাকারা ২:২২২ মাসিকের প্রসঙ্গে يَطْهُرْنَ ও تَطَهَّرْنَ—দুই ধরনের পবিত্রতার শব্দ এসেছে।

খ. পোশাকের পবিত্রতা وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ — “তোমার পোশাক, অতএব তা পবিত্র কর।”

সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৪। এটি কুরআনে পবিত্রতা ও পোশাকের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত।

গ. স্থান বা গৃহের পবিত্রতা ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে বলা হয়েছিল: أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ অর্থাৎ, “তোমরা আমার ঘরকে পবিত্র কর।” ২:১২৫, ২২:২৬।

অতএব পবিত্রতা শুধু ব্যক্তির শরীরের বিষয় নয়; স্থানও পবিত্র/পরিশুদ্ধ রাখার বিষয়টি কুরআনে আছে।

ঘ. অন্তরের পবিত্রতা কুরআন সরাসরি قُلُوبَهُمْ — তাদের অন্তর-এর সঙ্গে পবিত্রতার সম্পর্ক স্থাপন করেছে:

৫:৪১ আল্লাহ যাদের অন্তরকে পবিত্র করতে চাননি। আবার ৩৩:৫৩-এ বলা হয়েছে, একটি নির্দিষ্ট আচরণ হৃদয়ের জন্য অধিক পবিত্র।

অর্থাৎ পবিত্রতা মানসিক ও নৈতিক ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ঙ. আত্মশুদ্ধি ৯:১০৩-এ সদকা সম্পর্কে বলা হয়েছে: “যা তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ করবে।”

এখানে تُطَهِّرُهُمْ এবং تُزَكِّيهِمْ—দুটি শব্দ পাশাপাশি এসেছে।

এখানে পবিত্রতা কেবল ধৌত করা নয়; বরং নৈতিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধির ধারণাও প্রকাশ করে।

চ. পাপ ও কলুষতা থেকে মুক্তি ৩৩:৩৩-এ বলা হয়েছে: “আল্লাহ তোমাদের থেকে অপবিত্রতা/কলুষতা দূর করতে এবং তোমাদের পূর্ণরূপে পবিত্র করতে চান।”

এখানে الرِّجْس — রিজস এবং يُطَهِّرَكُمْ — তোমাদের পবিত্র করেন পাশাপাশি এসেছে।

৩. কুরআনের আলোকে “পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা”  বলতে কী বোঝায়?

কুরআন “পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা”কে একটি মাত্র শব্দে সংজ্ঞায়িত করেনি। বরং বিভিন্ন নির্দেশের মাধ্যমে ধারণাটি প্রকাশ করেছে।

১. পানি দ্বারা পরিশুদ্ধ হওয়া ৫:৬, ৮:১১, ২৫:৪৮

২. পোশাক পরিষ্কার রাখা ৭৪:৪

৩. উপাসনার স্থান পরিষ্কার রাখা ২:১২৫, ২২:২৬

৪. যৌন/শারীরিক অপবিত্রতা থেকে পরিশুদ্ধ হওয়া ২:২২২, ৫:৬

৫. নিজেকে পরিষ্কার ও পবিত্র রাখার অভ্যাস ৯:১০৮

৬. খাদ্যের ক্ষেত্রে পবিত্র/উত্তম বস্তু গ্রহণ এখানে কুরআন طَيِّب — ত্বাইয়িব শব্দ ব্যবহার করেছে: ২:১৬৮, ৫:৪, ৭:৩২, ১৬:১১৪, ২৩:৫১ ইত্যাদি।

৭. অন্তরকে কলুষতা থেকে মুক্ত রাখা ৫:৪১, ৩৩:৫৩, ৩৩:৩৩

সুতরাং গবেষণামূলকভাবে বলা যায়: কুরআনের “পবিত্রতা” একটি বহুমাত্রিক ধারণা—শরীর, পোশাক, স্থান, পানি, যৌন-শুচিতা, খাদ্য, অন্তর এবং নৈতিক-আত্মিক অবস্থার পরিশুদ্ধতা এর বিভিন্ন ক্ষেত্র।

৪. পবিত্রতা বিষয়ে কুরআনের আয়াতসমূহঃ

২:২৫ “তাদের জন্য সেখানে পবিত্র জীবনসঙ্গী থাকবে এবং তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে।”

২:১২৫ “আমি ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে নির্দেশ দিয়েছিলাম—তোমরা আমার ঘরকে পবিত্র কর, তাওয়াফকারীদের, অবস্থানকারীদের এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য।”

২:২২২ “তোমার কাছে তারা মাসিক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, তা কষ্টকর অবস্থা। অতএব মাসিক অবস্থায় নারীদের থেকে পৃথক থাকো এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা নিজেদের পবিত্র করে, তখন আল্লাহ যেভাবে তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে তাদের কাছে যাও। নিশ্চয় আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা নিজেদের পবিত্র রাখে তাদেরও ভালোবাসেন।”

২:২৩২ “এটি তোমাদের জন্য অধিক কল্যাণকর এবং অধিক পবিত্র। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।”

৩:১৫ “…এবং তাদের জন্য থাকবে পবিত্র জীবনসঙ্গী এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।”

৩:৪২ “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন, তোমাকে পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বজগতের নারীদের ওপর তোমাকে মনোনীত করেছেন।”

৩:৫৫ “…আমি তোমাকে আমার দিকে তুলে নেব এবং যারা অবিশ্বাস করেছে তাদের থেকে তোমাকে পবিত্র করব…”

৪:৫৭ “…তাদের জন্য থাকবে পবিত্র জীবনসঙ্গী এবং আমি তাদের প্রবেশ করাব ঘন ছায়ায়।”

৫:৬ “…কিন্তু তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের ওপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।”

৫:৪১ “…তারা এমন লোক যাদের অন্তরকে আল্লাহ পবিত্র করতে চাননি…”

৮:১১ “…তিনি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করলেন, যাতে তা দিয়ে তোমাদের পবিত্র করেন, তোমাদের থেকে শয়তানের অপবিত্রতা দূর করেন, তোমাদের হৃদয় দৃঢ় করেন এবং এর মাধ্যমে তোমাদের পদক্ষেপ স্থির করেন।”

৯:১০৩ “তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ কর; এর মাধ্যমে তুমি তাদের পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ করবে…”

৯:১০৮ “…সেখানে এমন লোক রয়েছে যারা নিজেদের পবিত্র রাখতে ভালোবাসে। আর আল্লাহ পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।”

১১:৭৮ “সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! এরা আমার কন্যা; তারা তোমাদের জন্য অধিক পবিত্র…’”

২২:২৬ “…আমার ঘরকে পবিত্র রাখো তাওয়াফকারী, অবস্থানকারী, রুকুকারী ও সিজদাকারীদের জন্য।”

২৫:৪৮ “আর তিনি আকাশ থেকে বিশুদ্ধ পানি বর্ষণ করেছেন।”

৩৩:৩৩ “…আল্লাহ তো চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে, হে আহলে বাইত, এবং তোমাদের পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।”

৩৩:৫৩ “…এটি তোমাদের হৃদয় ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিক পবিত্র।”

৫৬:৭৯ “তা স্পর্শ করে না, তবে যারা পবিত্র তারা ছাড়া।”

৫৮:১২ “…এটি তোমাদের জন্য উত্তম এবং অধিক পবিত্র…”

৭৪:৪ “আর তোমার পোশাক পবিত্র রাখো।”

৭:৮২ “তাদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও; তারা এমন লোক যারা নিজেদের পবিত্র রাখে।”

২৭:৫৬ “তাদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও; তারা এমন লোক যারা নিজেদের পবিত্র রাখে।”

৭৬:২১ “…তাদের রব তাদেরকে বিশুদ্ধ পানীয় পান করাবেন।”

৮০:১৪ “সম্মানিত, সমুন্নত, পবিত্র।”

৯৮:২ “আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রাসূল, যিনি পবিত্র পত্রসমূহ পাঠ করেন।” (৯৮:২)

এই তালিকার শব্দগুলো কুরআনে ط ه ر মূলের বিভিন্ন রূপে এসেছে।

কুরআনের ভাষায় “পবিত্রতা” এবং “পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতা” কে সম্পূর্ণ সমার্থক করা ঠিক হবে না।

মুলত طَهَرَ (তাহারা)  পবিত্র/পরিশুদ্ধ হওয়া বোঝায়; আর زَكَّى (যাক্কা) মূলত পরিশুদ্ধ/বিকশিত/আত্মশুদ্ধির একটি বিস্তৃত ধারণা বহন করে। কুরআনে ط ه ر মূলের ৩১টি ব্যবহার এবং ز ك و মূলের ৫৯টি ব্যবহার রয়েছে।

অন্যদিকে نَظَافَة (নাযাফাহ)—যেটিকে আধুনিক আরবিতে “পরিচ্ছন্নতা” বলা হয়—কুরআনের ব্যবহৃত মূল শব্দ নয়। তাই গবেষণায় “কুরআনে পরিচ্ছন্নতা” বলতে সরাসরি نظافة খোঁজার পরিবর্তে ط ه ر, ز ك و, ر ج س, ط ي ب ইত্যাদি শব্দমূলের ব্যবহার বিশ্লেষণ করা অধিক ফলপ্রসূ।

পত্রতা। ( ৫:৯০) আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত  ৫:৬-এ আল্লাহ বলেন: “কিন্তু তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের ওপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করতে চান।” (৫:৬)

অনুরুপ ৮:১১-এ: “এবং তোমাদের থেকে শয়তানের অপবিত্রতা দূর করেন।” এখানে رِجْز এসেছে—যা رِجْس-এর কাছাকাছি অর্থ ক্ষেত্রের শব্দ চারটি শব্দকে পাশাপাশি রাখলে

১) طَهَرَ (তাহারা) = পবিত্র/পরিশুদ্ধ হওয়া

২) زَكَّى (যাক্কা) = আত্মশুদ্ধি ও পরিশুদ্ধির মাধ্যমে উন্নতি

৩) طَيِّب (ত্বাইয়্যিব) = উত্তম, বিশুদ্ধ, কল্যাণকর

৪) رِجْس (রিজস) = অপবিত্রতা, কলুষতা, ঘৃণ্যতা

এভাবে দেখলে কুরআনিক “পবিত্রতা” একটি সমন্বিত ধারণা—শরীর, পোশাক, স্থান, খাদ্য, আচরণ এবং অন্তর—সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।

উপোরক্ত আলোচনা থেকে সিদ্ধান নেয়া যায় পবিত্রতার মুল লক্ষ্য আত্মশুদ্ধি।  রবের নির্দেশ মনে নিজের জীবন পরিচালনাকে পবিত্রতা বুঝিয়েছেন।  সেই সাথে খাদ্য পোষাক পরিচ্ছদ দেহের নাপাকী কিছু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখাকে পবিত্রতার অংশ বিবেচনা করা হয়েছে।

মুল পবিত্রতা নিজে হওয়া যায়না। আল্লাহর নিকট কামনা করতে হয়, অনুশীলন করতে হয়।  আল্লাহ তার শিরক মুক্ত বান্দাদের পবিত্র করেন এবং গ্রহন করেন পবিত্র বলে।  তিনি নিজে তাই নিজেকে পবিত্র ঘোষনা দিয়েছেন।

আল্লাহ পবিত্র!!  অযু গোসলের মাধ্যমে নয়। শিরক মুক্ত অংশীদারিত্ব নেই বলে। 

রাসুলকে পবিত্র করেছেন ওযু গোসলের মাধ্যমে নয়,  শিরক মুক্ত নাফসের মাধ্যমে।

“কিন্তু তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের ওপর তাঁর নিয়ামত পূর্ণ করতে চান।” (৫:৬)

আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রাসূল, যিনি পবিত্র পত্রসমূহ পাঠ করেন।” (৯৮:২)

“তা স্পর্শ করে না, তবে যারা পবিত্র তারা ছাড়া।”(৫৬:৭৯)

আয়াতে অযু গোসলের মাধ্যমে পবিত্র হয়ে স্পর্শ করার কথা বুঝায় না। বরং কিতাবের মর্ম যারা স্বীকার করে গ্রহন করে তাদের পবিত্র বলেছেন।  যারা এটি অস্বীকার করে তাদের অপবিত্র বলেছেন।

“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন, তোমাকে পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বজগতের নারীদের ওপর তোমাকে মনোনীত করেছেন।”(৩:৪২)

এ আয়াতে আল্লাহ রাসুলকে অযু – গোসল বা পানি দিয়ে ধুয়ে পরিস্কার করে পবিত্র করেছেন এমন বুঝায় না। বরং রাসুলকে কোরানের মর্ম বুঝিয়ে শিরকমুক্তের মাধ্যমে পবিত্র করেছেন মর্মে পবিত্র করা শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

By Ekramul hoq

I am A.K.M Ekramul hoq MA.LLB. Rtd Bank Manager & PO of Agrani Bank Ltd. I am interested writing and reading. Lives in Bangladesh, District Jamalpur.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

``` }