কওমে লুত ফেরস্তাদের যেখানে ছাড় দেইনি কওমী আলেম শিশুদের কেন ছাড় দিবে?
ফেরেশ্তারা যখন সুশ্রী মানুষরূপে লূত (আ.)-এর ঘরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি(লুত আঃ) ভীষণ উদ্বিগ্ন হন। সূরা হূদ ১১:৭৭
وَلَمَّا جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا سِيءَ بِهِمْ “যখন আমাদের বার্তাবাকগণ লূতের নিকট এল, তখন তাদের আগমনে সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলো।”
কারণ—লূত (আ.) জানতেন, তাঁর কওম অতিথির নিরাপত্তা রক্ষা করবে না। বলৎকারে লিপ্ত হবে।
খবর ছড়িয়ে পড়লে কওমের লোকেরা দৌড়ে এসে লূতের ঘর ঘিরে ফেলে। সূরা হূদ ১১:৭৮
وَجَاءَهُ قَوْمُهُ يُهْرَعُونَ إِلَيْهِ “তার সম্প্রদায় দৌড়ে দৌড়ে তার কাছে এসে হাজির হলো।” লূত (আ.)-এর শেষ সতর্কবার্তাঃ
লূত (আ.) তাদের নৈতিকতা ও পবিত্রতার দিকে আহ্বান করেন। সূরা হূদ ১১:৭৮ هَٰؤُلَاءِ بَنَاتِي هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ “এরা আমার কন্যারা—তোমাদের জন্য অধিক পবিত্র।”
কওমের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান করল। তারা নির্লজ্জভাবে উত্তর দেয়— সূরা হূদ ১১:৭৯ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا لَنَا فِي بَنَاتِكَ مِنْ حَقٍّ “তুমি জানো—তোমার কন্যাদের ব্যাপারে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই।”
অতঃপর নিরুপায় হয়ে ফেরেশতাদের আত্মপরিচয় প্রকাশ। চূড়ান্ত মুহূর্তে ফেরেশতারা নিজেদের পরিচয় দেন। সূরা হূদ ১১:৮১ ফেরেস্তারা লুত আঃ কে অভয় প্রদান করলেন। يَا لُوطُ إِنَّا رُسُلُ رَبِّكَ لَن يَصِلُوا إِلَيْكَ “হে লূত! আমরা তোমার রবের প্রেরিত; তারা তোমার ক্ষতি করতে পারবে না।”
এবং লূত (আ.)-কে বললেন – সূরা হূদ ১১:৮১ فَأَسْرِ بِأَهْلِكَ بِقِطْعٍ مِّنَ اللَّيْلِ “রাতের এক অংশে তুমি তোমার পরিবারকে নিয়ে বের হয়ে পড়ো।”
স্ত্রীকে বাদ দেওয়া হয়, কারণ— সূরা হূদ ১১:৮১ إِنَّهُ مُصِيبُهَا مَا أَصَابَهُمْ “তার ওপরও সেই আযাব আসবে যা তাদের ওপর আসবে।”
আল্লাহ্র শাস্তি আসে ভোরবেলায়। ভুমিকম্প। সূরা হূদ ১১:৮২–৮৩ جَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا “আমি জনপদটিকে উল্টে দিলাম।” وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهَا حِجَارَةً “এবং তাদের ওপর পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করলাম।”
কওমে লূতের ঘটনা ↔ আজকের সমাজে কওমী মাদ্রাসার কতিপয় আলেমের কর্মকাণ্ডঃ
এখানে “কওমী মাদ্রাসা” বলতে সব প্রতিষ্ঠান বা সব আলেম বোঝানো হচ্ছে না। কোরআনের দৃষ্টিতে আলোচনা করা হচ্ছে—যখন কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নৈতিক দায়িত্বের জায়গায় ব্যর্থ হয়, তখন কী রকম কওমে-লূতীয় প্যাটার্ন তৈরি হয়।
আজকের সমাজের প্রাসঙ্গিকতাঃ
যখন কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে— শিশু/কিশোর নির্যাতন,ক্ষমতার অপব্যবহার, নৈতিক অপরাধ ঘটলেও সেটিকে ‘ব্যক্তিগত ভুল’ বলে চাপা দেওয়া হয়,। শুদ্ধ আত্ম সমালোচনা হয় না, বরং প্রতিষ্ঠান রক্ষা পায়—তখন সেটি অবশ্যই কওমে লূতের “অভ্যাসগত সাইয়্যিআত” পর্যায়ে পড়ে। লূত (আ.) ছিলেন একা—আজও ভেতরের সত্যবাদীরা একা। সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৮০ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ “তোমরা কি এমন অশ্লীলতায় লিপ্ত হচ্ছ”
আজকে সমাজে তদ্রুপ যখন কোনো কওমী মাদ্রাসার ভেতরে— কোনো শিক্ষক,কোনো ছাত্র,কোনো অভিভাবক, নৈতিক প্রশ্ন তোলে, তখন প্রায়ই দেখা যায়— তাকে চুপ করানো হয়। “ফিতনা” বলা হয় কখনো বা সমাজচ্যুত করা হয়। এটাই লূত (আ.)-কে একা করে দেওয়ার সামাজিক মডেল। কারন কওমে লূতের দাবি ছিল: “তুমি জানো আমরা কী চাই” সূরা হূদ ১১:৭৯ وَإِنَّكَ لَتَعْلَمُ مَا نُرِيدُ “তুমি তো জানো—আমরা কী চাই।”
অপরাধীরা নিজেদের অপরাধ লুকায় না,বরং দাবি হিসেবে উপস্থাপন করে। আজ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়— ক্ষমতাসীন আলেমদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও বলা হয়: “এই জ্ঞান ছাড়া ইসলাম থাকবে না” “প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা যাবে না” অর্থাৎ নৈতিক প্রশ্নের বদলে ‘স্বার্থ’ সামনে আনা হয়। কওমে লূতের মতোই: “আমরা জানি আমরা কী করছি”
লূত (আ.)-এর কন্যা প্রস্তাব = নৈতিক বিকল্পের প্রস্তাব هَٰؤُلَاءِ بَنَاتِي هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ লূত (আ.) বিকল্প দেন। বৈধ, পবিত্র পথ দেখান।
ঠিক অনুরুপ আজো একই প্রশ্ন: ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি— যৌন নৈতিকতা, ক্ষমতার সীমা শিশু সুরক্ষা, স্বচ্ছ জবাবদিহি। এই বিষয়ে বাস্তব নীতিমালা দিয়েছে?
না দিলে— তারা লূত (আ.)-এর বিপরীত অবস্থানে দাঁড়ায়।
লূতের স্ত্রী: ভেতরের মানুষ হয়েও সত্যের পক্ষে না থাকা। إِنَّهُ مُصِيبُهَا مَا أَصَابَهُمْ (১১:৮)
তিনি নবীর স্ত্রী। কিন্তু নৈতিক অবস্থানে ছিলেন না।
আজকের প্রাসঙ্গিকতাও একই। আজ অনেক ক্ষেত্রে—পরিচালনা বোর্ড, সিনিয়র আলেম প্রভাবশালী মহল সব জানে, কিন্তু— লুতের স্ত্রীর মত চুপ থাকে। অপরাধ ঢাকে।
কোরআনের ভাষায়— “ভেতরের মানুষ হয়েও কওমের দলে চূড়ান্ত ধ্বংস: আযাব আসে অশ্লীলতার কারণে নয়—ইনকারের কারণে। কওমে লূত শুধু অপরাধ করেনি তারা সতর্ক বার্তা প্রত্যাখ্যান করেছে। সংশোধনের সুযোগ নষ্ট করেছে। তাই আযাব এসেছে।
আজকের সতর্কতাঃ যদি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান— আত্মশুদ্ধি অস্বীকার করে, নৈতিক সংস্কারকে “শত্রুতা” মনে করে,কোরআনের নৈতিকতা নয়, প্রতিষ্ঠানের ইজ্জত বাঁচায়,- তবে কোরআনিক দৃষ্টিতে এটি ধ্বংসের পথে অগ্রসর সমাজ।
