যদি আল্লাহই একক পরম অস্তিত্ব হন এবং তাঁর বাইরে কোনো স্বাধীন চূড়ান্ত অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে সৃষ্টির চূড়ান্ত উৎসও তাঁর বাইরে খোঁজা যায় না।
আল্লাহ যখন একক ছিলেন এবং তাঁর বাইরে কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব ছিল না, তখন পরবর্তীতে যে মহাবিশ্ব, পদার্থ, শক্তি ও প্রাণের অস্তিত্ব হলো—সেগুলোর চূড়ান্ত উৎস কী?
যদি আল্লাহই পরম একক ও সর্বময় উৎস হন, তবে সৃষ্টির জন্য তাঁর বাইরে আর কোনো স্বাধীন চূড়ান্ত উপাদান বা উৎস থাকা যুক্তিগতভাবে কঠিন। কারণ সেই দ্বিতীয় উৎসও যদি অনাদি ও স্বাধীন হয়, তবে পরম একত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে। আর যদি দ্বিতীয় উৎস নিজেই সৃষ্ট হয়, তাহলে আবার তার উৎসের প্রশ্ন আসে।
অতএব দার্শনিকভাবে বলা যায়—সৃষ্ট জগতের চূড়ান্ত ভিত্তি আল্লাহর বাইরে কোনো স্বাধীন সত্তা নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে সৃষ্টি আল্লাহর ‘অংশ’। বরং সৃষ্টি তাঁর ইচ্ছা, আদেশ ও সৃষ্টিশক্তির অধীন অস্তিত্ব লাভ করেছে।
পৃথিবী এসেছে ➡️নক্ষত্র থেকে, নক্ষত্র এসেছে ➡️গ্যাস থেকে, গ্যাস এসেছে ➡️ মৌল থেকে, মৌল এসেছে ➡️পরমাণু থেকে পরমাণু এসেছে➡️ মৌলিক কণা থেকে, মৌলিক কণা এসেছে➡️ quantum field থেকে।
তাহলে প্রশ্ন: Quantum field কোথা থেকে?
যদি বলা হয় অন্য কোনো ক্ষেত্র থেকে, আবার প্রশ্ন: সেটি কোথা থেকে।
যদি গ্রহ, নক্ষত্র, পানি, মাটি, মানুষ, ইলেকট্রন—সবই আল্লাহর অংশ না হয়, তাহলে এগুলোর মৌলিক উপাদান কোথা থেকে এলো? আর সেই উপাদানের চূড়ান্ত উৎস কী?
“বহুরূপ জগতের অন্তরালে একক পরম অস্তিত্ব; রূপ বদলায়, জগত বদলায়—কিন্তু পরম উৎস অবিনশ্বর।”
“বিশ্বজগতের বহুত্বের অন্তরালে রয়েছে একক পরম উৎস। আমরা যে পদার্থ, শক্তি, প্রাণ, নক্ষত্র, গ্রহ ও অণু-পরমাণুর বহুরূপতা দেখি, সেগুলো বিচ্ছিন্ন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্তিত্ব নয়; তারা একটি সুসংবদ্ধ মহাবিশ্বের পরস্পর-সম্পর্কিত রূপ। প্রকৃতির দৃশ্যমান স্তরে সৃষ্টি ও বিনাশের পরিবর্তে রূপান্তর একটি মৌলিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনশীল রূপের অন্তরালে যে পরম, অনাদি ও অবিনশ্বর সত্তা—কুরআন তাঁকেই ‘আল-আউয়াল’ ও ‘আল-আখির’, প্রথম ও শেষ বলে নির্দেশ করে।
“তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ; তিনিই প্রকাশ্য এবং তিনিই অপ্রকাশ্য।” সূরা আল-হাদীদ ৫৭:৩
তবে সেই পরম সত্তাকে কেবল ‘শক্তি’ বলা যথেষ্ট নয়; কারণ শক্তি নিজেই আমাদের মহাবিশ্বের একটি ভৌত ধারণা। বরং বলা অধিক যুক্তিসঙ্গত—সকল শক্তি ও অস্তিত্বের চূড়ান্ত উৎস সেই পরম সত্তা। সৃষ্টিজগত তাঁর সরাসরি অংশ নয়; বরং তাঁর সৃষ্টিশক্তি ও বিধানের অধীন বহুরূপ প্রকাশ।”
কোরানের ভাযায় এজন্য বলা হয়েছে: “তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ; তিনিই প্রকাশ্য এবং তিনিই অপ্রকাশ্য।” সূরা আল-হাদীদ ৫৭:৩
“পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে সবই ক্ষয়শীল; আর তোমার রবের সত্তা অবশিষ্ট থাকবে।”৫৫:২৬–২৭
“যতদিন আসমানসমূহ ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে…”১৪:২৮
কিন্তু এখান থেকে সরাসরি বলা যায় না যে বর্তমান পৃথিবী ও বর্তমান মহাবিশ্বই অনন্তকাল একই অবস্থায় থাকবে।
বরং ১৪:৪৮-এর সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে একটি গভীর প্রশ্ন তৈরি হয়:
যদি পৃথিবী অন্য পৃথিবীতে পরিবর্তিত হয়, তাহলে ১১:১০৭–১০৮-এর “আসমান ও জমিন” কোন পর্যায়ের আসমান ও জমিন?
“ধ্বংস নয়, এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তন”
—এই ধারণার সঙ্গে ১৪:৪৮-এর “পৃথিবী অন্য পৃথিবীতে পরিবর্তিত হবে” কথাটি তুলনা করা যায়।
পৃথিবী ধ্বংস হবে না; বরং এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত হবে।এটি কোরান এবং বিজ্ঞান উভয়ই সমর্থন করে।
কারন কোরান ১৪:৪৮ আয়াতে বলে: “যেদিন পৃথিবী অন্য পৃথিবীতে এবং আসমানসমূহ অন্য আসমানসমূহে পরিবর্তিত হবে. ..”১৪:৪৮
সুতরাং নিশ্চিত ভাবে বলা যায়: সৃষ্টির দৃশ্যমান প্রক্রিয়ায় রূপান্তর একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।”
আল্লাহর সৃষ্টিশীল কর্মকে আমরা যখন প্রকৃতির স্তরে দেখি, তখন সেখানে রূপান্তর, বিন্যাস ও পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা দেখতে পাই।
প্রতিনিয়ত প্রতিক্ষন তিনি নতুন কিছু কর্মে ব্যাস্ত থাকেন।
“প্রতিদিন/প্রতিক্ষণ তিনি এক নতুন কর্মে/অবস্থায় আছেন।” ৫৫:২৯
আল্লাহর সৃষ্টিশীল কর্মকে আমরা যখন প্রকৃতির স্তরে দেখি, তখন সেখানে রূপান্তর, বিন্যাস ও পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা দেখতে পাই।
“তিনি কোনো পার্থিব বা ভৌত শক্তি নন; বরং সকল শক্তি, পদার্থ, জীবন ও অস্তিত্বের পরম উৎস।”
“তার অস্তিত্তই প্রকৃতি ও বিশ্ব ভ্রমান্ড, সকল আলমসমূহ।”
আমরা মহাবিশ্বের বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন বস্তু নই; আমরা মহাবিশ্বেরই অংশ।
এক পরম অস্তিত্ব—যিনি সকল অস্তিত্বের উৎস। তাঁর সৃষ্ট জগতের মধ্যে আমরা অসংখ্য রূপ, বস্তু, প্রাণ ও শক্তির প্রকাশ দেখি। প্রকৃতিতে কোনো কিছুই বিচ্ছিন্ন নয়; পদার্থ ও শক্তি এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হয়, জীবন জন্ম নেয়, পরিবর্তিত হয় এবং বিলীন হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনশীল বহুরূপতার অন্তরালে রয়েছে একক উৎস ও একটি সুসংবদ্ধ অস্তিত্বব্যবস্থা।
অতএব, জগতের বহুত্ব তার উৎসের বহুত্ব প্রমাণ করে না। বহুরূপ প্রকাশের অন্তরালে একক উৎসের ধারণাই এখানে মূল প্রশ্ন।
তবে কুরআনের ভাষায় সেই পরম উৎসকে কেবল ‘শক্তি’ বলে সীমাবদ্ধ করা যায় না; কারণ আল্লাহ কোনো পরিচিত সৃষ্ট বস্তুর সমতুল্য নন। তিনি সৃষ্টির উৎস ও স্রষ্টা, আর বিশ্বজগত তাঁর হতে সৃষ্টি।
