Categories
Blog

মহাজগত পরিস্ফুটন

 

Episode -01 মহাবিশ্বের পরিস্ফুটনঃ

মানুষের সৃষ্টি কুরআনের বর্ণনায় সৃষ্টির সূচনা নয়। বরং আদমের সৃষ্টির বহু আগে থেকেই আল্লাহ মহাজগতের সৃষ্টিকর্ম সম্পন্ন করেছেন এমন একটি ধারাবাহিক ইঙ্গিত কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেনঃ 

“তিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন, তখন তা ছিল দুখান (دُخَانٌ)। অতঃপর তিনি সেগুলোকে সাত আকাশে বিন্যস্ত করলেন…”(২:২৯)

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আয়াতটি পৃথিবীর সৃষ্টি এবং আকাশের دُخَان (দুখান) অবস্থার কথা পাশাপাশি এনেছে।

দুখান শব্দের সাধারণ অর্থ ধোঁয়া বা ধোঁয়ার মতো অবস্থা। কিন্তু এটিকে সরাসরি আধুনিক বিজ্ঞানের “গ্যাসীয় নীহারিকা” বা “বিগ ব্যাংয়ের ধোঁয়া” বলে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। বরং কুরআনের নিজস্ব ভাষায় বলা যায়—আকাশ তখন এমন একটি অবিন্যস্ত/ধোঁয়াসদৃশ অবস্থায় ছিল, যা পরবর্তীতে বিন্যস্ত করা হয়।

২. আকাশ ও পৃথিবী  একত্রিত অবস্থায় ছিল?

“অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী উভয়েই একত্রিত ছিল (رَتْقًا), অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম (فَفَتَقْنَاهُمَا), এবং পানি থেকে প্রত্যেক জীবন্ত জিনিস সৃষ্টি করলাম?” (২১:৩০)

এখানে رَتْقًا — রতকান। অর্থ: সংযুক্ত, বন্ধ, একত্রিত বা অবিচ্ছিন্ন অবস্থা।

এখানেই মহাবিশ্বের “পরিস্ফুটন” বা ক্রমশ প্রকাশিত হওয়ার ধারণাটি নিয়ে গবেষণার একটি বড় ক্ষেত্র তৈরি হয়।

আয়াতটিকে সরাসরি আধুনিক Big Bang theory-এর সমার্থক বলে আমি দাবী করছি না।  বরং আয়াতটি মহাজগতের একটি প্রাথমিক একত্রিত অবস্থা এবং পরবর্তী পৃথকীকরণ সম্পর্কে গভীর একটি চিত্র উপস্থাপন করছি।

৩.“দুখান” মহাজগতের একটি প্রাথমিক অবস্থা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা এসেছে সূরা ফুসসিলাত ৪১:৯–১২-এ।

আল্লাহ প্রথমে পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে বলেনঃ 

“বলুন, তোমরা কি সেই সত্তাকে অস্বীকার কর যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দুই দিনে…” ৪১:৯ এরপর বলেন—

“তিনি তার উপর সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, তাতে বরকত রেখেছেন এবং তাতে তার খাদ্য/জীবিকার ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছেন—চার দিনে…” ৪১:১০

তারপর আসে আকাশের প্রসঙ্গ—

“অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন, যখন তা ছিল দুখান; অতঃপর তিনি আকাশ ও পৃথিবীকে বললেন, ‘তোমরা উভয়ে আসো—ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়।’ তারা বলল, ‘আমরা অনুগত হয়ে এলাম।’” (৪১:১১)

“অতঃপর তিনি সেগুলোকে দুই দিনে সাত আকাশে সম্পন্ন/বিন্যস্ত করলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তার বিধান নির্ধারণ করলেন…” ৪১:১২

৪. ছয় দিনের সৃষ্টি—কীভাবে ধারাটি বোঝা যায়?

কুরআন বারবার জানায় যে আল্লাহ আসমানসমূহ ও পৃথিবীকে ছয় দিনে/পর্বে সৃষ্টি করেছেন।

“নিশ্চয়ই তোমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হয়েছেন।” সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৫৪

আর সূরা হূদে বলা হয়েছে— “তিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর আরশ ছিল পানির উপর…” ১১:৭

সূরা ফুসসিলাত ৪১:৯–১২-এর বক্তব্যকে সময়ের ধাপ হিসেবে পড়লে একটি কাঠামো দাঁড়ায়:

প্রথম ধাপ: পৃথিবীর সৃষ্টি — ২ দিন দ্বিতীয় ধাপ: পৃথিবীর পর্বত, বরকত ও জীবিকার ব্যবস্থা ২ দিন পর্যন্ত। এই মোট ৪ দিন। তৃতীয় ধাপ: আকাশ তখন দুখান অবস্থায়। চতুর্থ ধাপ: আকাশসমূহকে দুই দিনে সাত আকাশে বিন্যস্ত করা  এই সর্বমোট ৬ দিন।

৫.“আরশ ছিল পানির উপর”—একটি গভীর মহাজাগতিক ইঙ্গিত। সূরা হূদ ১১:৭ আমাদের সামনে আরও একটি প্রশ্ন রাখে: “তাঁর আরশ ছিল পানির উপর।”

এটি এমন একটি প্রাথমিক সৃষ্টিস্থিতির কথা জানায়, যার প্রকৃতি আমাদের বর্তমান পরিচিত পৃথিবী, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির মতো নয়।

৬. নক্ষত্র ও মহাজগতের বিশালতার দিকে দৃষ্টি। এরপর কুরআন আমাদের মানুষের দৃষ্টি পৃথিবী থেকে তুলে মহাজগতের দিকে নিয়ে যায়।

আল্লাহ বলেন— “আমি নক্ষত্রসমূহের অবস্থান/অস্তাচলের শপথ করছি; নিশ্চয়ই এটি এক মহাশপথ—যদি তোমরা জানতে!”(৫৬:৭৫–৭৬)

এটি শুধু আকাশের সৌন্দর্য দেখার আহ্বান নয়; বরং নক্ষত্রের অবস্থান, মহাজাগতিক বিন্যাস এবং মানুষের জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে চিন্তার আহ্বান হিসেবেও পড়া যায়।

৭. আকাশে আমাদের রিজিক?

কুরআন আরও বলে— “আর আকাশেই রয়েছে তোমাদের রিজিক এবং যা তোমাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।”(৫১:২২)

এই আয়াতটি বিশেষভাবে চিন্তার উদ্রেক করে।মানুষের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান পৃথিবীতে পাওয়া গেলেও সেই উপাদানগুলোর অনেকগুলোর মহাজাগতিক উৎস রয়েছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান আমাদের দেখিয়েছে যে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মৌল তৈরি হয় এবং নক্ষত্রের জীবনচক্র মহাবিশ্বে পদার্থের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাই ৫১:২২ আয়াতটি মহাজগত ও মানবজীবনের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গভীর চিন্তার দরজা খুলে দেয়।

৮.এরপর আসে মানুষ—খলিফার পরিকল্পনা মহাজগতের এই দীর্ঘ সৃষ্টিপর্বের পর কুরআনের বর্ণনা মানুষের দিকে আসে।

আল্লাহ বলেন—

“আর যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা স্থাপন করতে যাচ্ছি।’”  ২:৩০

অর্থাৎ পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবকে কুরআন একটি বৃহত্তর সৃষ্টির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে।

৯.“আমি কি তোমাদের রব নই?”—মানব অস্তিত্বের আরেক স্তর। এরপর আসে সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৭২

“আর যখন তোমার রব আদমসন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষ্য গ্রহণ করলেন—‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’”

তাই গবেষণামূলক ভাষায় বলা যায় মানুষের পৃথিবীতে আবির্ভাবের পূর্বেই তার সঙ্গে রবের সম্পর্কের একটি মৌলিক সাক্ষ্য বা অঙ্গীকারের কথা কুরআন স্মরণ করিয়ে দেয়।

১০. তাহলে আদম কোথায় দাঁড়ালেন?

এখন পুরো ধারাটি একত্র করলে একটি বিস্ময়কর চিন্তার কাঠামো পাওয়া যায়: মহাজগতের প্রাথমিক অবস্থা আকাশ ও পৃথিবীর একত্রিত/সংযুক্ত অবস্থা — ২১:৩০ পৃথকীকরণ — فَفَتَقْنَاهُمَا পৃথিবীর সৃষ্টি ও বিন্যাস — ৪১:৯–১০ আকাশ দুখান অবস্থায় — ৪১:১১ সাত আকাশের বিন্যাস — ৪১:১২ আসমান ও পৃথিবীর ছয় দিনের সৃষ্টিক্রম — ৭:৫৪, ১১:৭ নক্ষত্রসমূহের অবস্থান — ৫৬:৭৫–৭৬ আকাশ ও পৃথিবীর সঙ্গে জীবনের রিজিকের সম্পর্ক — ৫১:২২ পৃথিবীতে খলিফা স্থাপনের ঘোষণা — ২:৩০ আদমসন্তানের রবের সঙ্গে সাক্ষ্য/অঙ্গীকার — ৭:১৭২ অতঃপর পৃথিবীর বুকে আদমের মানবিক অধ্যায়ের সূচনা।

১১. এখানেই শুরু হয় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এই ধারাবাহিকতার পর আমাদের সামনে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায়—

আদম কী দিয়ে সৃষ্টি হলেন?

যদি মহাবিশ্ব আগে সৃষ্টি হয়ে থাকে, নক্ষত্র সৃষ্টি হয়ে থাকে, পৃথিবী গঠিত হয়ে থাকে এবং পৃথিবীতে জীবনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়ে থাকে—তাহলে আদমের দেহের উপাদানগুলো কোথা থেকে এলো?

কুরআন এখানেই আমাদের দৃষ্টি আবার নক্ষত্রের দিকে ফিরিয়ে দেয়। “নক্ষত্রসমূহের অবস্থান”—৫৬:৭৫।

আধুনিক বিজ্ঞান জানায়, মানুষের দেহে থাকা কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ক্যালসিয়াম, লোহা ইত্যাদি মৌল মহাজাগতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষত হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের বাইরে বহু ভারী মৌল নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ নিউক্লিয়ার প্রক্রিয়া এবং নক্ষত্রের বিস্ফোরণ/মৃত্যুর মাধ্যমে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে।

তাই “আমরা নক্ষত্রের সন্তান”—এটি একটি সুন্দর বৈজ্ঞানিক উপমা। এর কঠোর বৈজ্ঞানিক অর্থ হলো: মানবদেহের বহু মৌলের উৎস মহাজাগতিক নক্ষত্রীয় ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত।

এখান থেকে পরবর্তী গবেষণার প্রশ্ন হতে পারে— “আদম কোন উপাদান থেকে সৃষ্টি হলেন?”

কুরআন এক জায়গায় তাঁকে তুরাব (মাটি/ধূলি), কোথাও তীন (কাদা), কোথাও হামা’ মাসনূন, কোথাও সালসাল ইত্যাদি শব্দে বর্ণনা করে।

তাহলে কি এগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন বর্ণনা, নাকি একই সৃষ্টি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়?

এবং আরও গভীর প্রশ্ন: পৃথিবীর মাটি যদি মহাজাগতিক পদার্থের সমষ্টি হয়, আর সেই পদার্থের বহু মৌল যদি নক্ষত্রীয় ইতিহাসের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়ে থাকে—তাহলে “নক্ষত্রের কসম” এবং “মানুষের সৃষ্টি” কি কুরআনের বর্ণনায় একই বৃহৎ সৃষ্টিচক্রের দুটি ভিন্ন প্রান্ত?

সেখানেই “মহাবিশ্বের পরিস্ফুটন” থেকে “আদমের আবির্ভাব”—এই দীর্ঘ কুরআনিক চিন্তার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো তৈরি হতে পারে। Episode 2 তে।

By Ekramul hoq

I am A.K.M Ekramul hoq MA.LLB. Rtd Bank Manager & PO of Agrani Bank Ltd. I am interested writing and reading. Lives in Bangladesh, District Jamalpur.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

``` }