Categories
Blog

হজ্জ

 

হজ্জ = আল্লাহর উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ইবাদতের মাধ্যমে একটি আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া, যেখানে বিশ্ব মুসলিম একত্র হয়ে মহাসম্মেলনে যোগ দিয়ে তাকওয়া, ত্যাগ ও ঐক্যের বাস্তব অনুশীলন করে।

হজ কিভাবে করতে হয় কোরানের আলোকে আলোচনা করা হলোঃ

৩ ফরজ + ৬ ওয়াজিব + সুন্নত = পূর্ণ হজ

হজে ফরজ তিনটি। ১) ইহরাম (নিয়ত) ২) আরাফাতে অবস্থান ৩) তাওয়াফে ইফাদা।

হজের  ওয়াজিব ছয়টি। ১) সাঈ (সাফা–মারওয়া) ২) মিনা থাকা ৩) রমি (শয়তানকে পাথর মারা) ৪) কুরবানী (হাদী) ৫) চুল কাটা (হালক/তাকসীর) ৬) বিদায়ী তাওয়াফ

হজের সুন্নত (গুরুত্বপূর্ণগুলো) ১) গোসল করে ইহরাম ২) তালবিয়া পড়া ৩) কাবা দেখে দোয়া ৪) তাওয়াফে দোয়া ও যিকির ৫) আরাফাতে বেশি দোয়া ৬) মুযদালিফায় রাত থাকা

কোরানের আলোকে হজ ফরজের নির্দেশনাঃ

১) ইহরাম (নিয়তসহ হজে প্রবেশ) সূরা আল-বাকারা 2:196 وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ “হজ ও উমরা আল্লাহর জন্য পূর্ণ করো” বুঝা যায়:হজ শুরুই হয় ইহরাম (নিয়ত) দিয়ে নিয়ত ছাড়া হজ শুরুই হবে না। তাই: এটি ফরজ।

২)  আরাফাতে অবস্থান (وقوف بعرفة) সূরা আল-বাকারা 2:198 فَإِذَا أَفَضْتُمْ مِنْ عَرَفَاتٍ “যখন তোমরা আরাফাত থেকে ফিরে আসো…” গভীর দিক: কুরআন ধরে নিয়েছে—তুমি অবশ্যই আরাফাতে ছিলে। তাই এটাকে কেন্দ্রীয় ধাপ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাই: আরাফাতে না গেলে হজই হবে না।

৩)  তাওয়াফ (কাবা প্রদক্ষিণ) সূরা আল-হাজ্জ 22:29 وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ “তারা যেন কাবা ঘর তাওয়াফ করে”।  তাই:  তাওয়াফ করা ফরজ।

হজ্জে ওয়াজিব কি কি? হজের ওয়াজিব ৬টি।

১)  সাঈ (সাফা–মারওয়া) সূরা আল-বাকারা 2:158 “সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন…দৌড়ানো (সাঈ) করতে হবে।

২) মিনায় অবস্থান (আইয়ামে তাশরীক) সূরা আল-বাকারা 2:203 “নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করো” মিনায় থাকা ও যিকির করা।

৩)  শয়তানকে পাথর মারা (রমি) মিনার নির্দিষ্ট স্থানে কংকর নিক্ষেপ (কুরআনে সরাসরি বিস্তারিত নেই, কিন্তু “أيام معدودات” এর অংশ হিসেবে আমল এসেছে)

৪) কুরবানী (هدى) সূরা আল-বাকারা 2:196 “সহজলভ্য কুরবানী করো”

৫)  মাথা মুন্ডন বা চুল ছোট করা (حلق / تقصير) সূরা আল-ফাতহ 48:27 “মাথা মুন্ডনকারী ও চুল ছোটকারী”

৬)  বিদায়ী তাওয়াফ (طواف الوداع) কোনো ওয়াজিব ইচ্ছাকৃত বা ভুলে বাদ গেলে: হজ বাতিল হবে না।  কিন্তু দম (কুরবানী) দিতে হবে।

গভীর উপলব্ধি ফরজ = হজের ভিত্তি ওয়াজিব = হজের পরিপূর্ণতা ফরজ ছাড়া হজ নেই। আর  ওয়াজিব ছাড়া হজ অপূর্ণ।

হজে সুন্নত কয়টি ও কি কি?

হজের প্রধান সুন্নতগুলো ১)  ইহরামের আগে গোসল করা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে ইহরাম বাঁধা সুগন্ধি ব্যবহার করা (পুরুষদের জন্য)

২)  ইহরামের কাপড় পরা। পুরুষ: ২টি সাদা কাপড়।নারী: স্বাভাবিক পর্দার পোশাক (ইহরামের বিশেষ পোশাক নেই)

৩)  মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধা। সূরা আল-বাকারা 2:197 “হজের মাসগুলো নির্ধারিত…” নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করার আগে নিয়ত করা।

৪) তালবিয়া পড়া। لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ… হজের আত্মিক ঘোষণা

৫)  কাবা দেখে প্রথম দোয়া ও তাকবীর। প্রথম দৃষ্টি পড়লে দোয়া করা। আল্লাহর প্রশংসা করা।

৬)  তাওয়াফে ইস্তিলাম ও রমল হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ/ইশারা করা প্রথম ৩ চক্করে দ্রুত হাঁটা (পুরুষদের জন্য)

৭)  সাঈ শুরু করার আগে সাফা পাহাড়ে উঠা সূরা আল-বাকারা 2:158 “সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন”

৮)  আরাফাতে বেশি দোয়া ও যিকির 2:198 মূল অবস্থান ফরজ, কিন্তু দোয়া ও কান্না সুন্নত আমল।

৯) মুযদালিফায় রাত কাটানো (পুরুষদের জন্য সুন্নত মত) সেখানে যিকির ও বিশ্রাম।

১০)  রমি (পাথর নিক্ষেপ) ধীরে ও তাকবীরসহ করা। প্রতিটি কংকরে “الله أكبر” বলা

১১)  তাওয়াফে বেশি দোয়া ও কুরআন তিলাওয়াত। প্রতিটি চক্করে আল্লাহকে স্মরণ করা

১২)  চুল কাটার সময় দোয়া ও নিয়ত রাখা 48:27 “محلقين” ও “مقصرين” এর মাধ্যমে অনুমোদন এসেছে।

হজের সম্পূর্ণ ম্যাপ (এক পাতায় সারাংশ)

ক) ফরজ (৩টি) — না হলে হজ হবে না ইহরাম (নিয়ত)। বর্ননা সুরা বাকারা 2:196 “وَأَتِمُّوا الْحَجَّ” তাই হজ শুরুই হয় নিয়ত দিয়ে।

২) আরাফাতে অবস্থান। বর্ননা সুরা বাকারা  2:198 “فَإِذَا أَفَضْتُمْ مِنْ عَرَفَاتٍ” তাই নির্দিষ্ট সময় আরাফাতে থাকা।

৩) তাওয়াফে ইফাদা। বর্ননা সুরা হজ্জ  22:29 “وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ” তাই  কাবা ঘর প্রদক্ষিণ ফরজ।

খ) ওয়াজিব (৬টি) — বাদ দিলে দম (কুরবানী) লাগে।

১) সাঈ (সাফা–মারওয়া) বর্ননা সুরা বাকারা  2:158 ২) মিনা অবস্থান (আইয়ামে তাশরীক)। বর্ননা সুরা বাকারা  2:203 ৩)  রমি (শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ)। আমল দ্বারা প্রমাণিত ৪) কুরবানী (হাদী)। বর্ননা সুরা বাকারা  2:196

৫) চুল কাটা / ন্যাড়া (حلق / تقصير) নির্দেশ সুরা ফাতাহ  48:27

হজ শুধু ইবাদত না। এটি একটি পূর্ণ “আত্মশুদ্ধির সফর”

শুরু → নিয়ত। মাঝখান → ত্যাগ ও স্মরণ। শেষ → নতুন মানুষ হয়ে ফেরা।

দম (Dam) কী?

—কিছু ওয়াজিব কাজ ইচ্ছাকৃত বা ভুলে ছুটে গেলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি কুরবানী (দম) দিতে হয়। একে “দম” বলে। “দম” = একটি ছোট পশু কুরবানী (ভেড়া/ছাগল) এটি কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) হিসেবে দেওয়া হয়।

কখন দম দিতে হয়? হজের কোনো ওয়াজিব বাদ পড়লে দম লাগে।

যেসব ক্ষেত্রে সাধারণত দম লাগে ১)  রমি (পাথর মারা) বাদ গেলে শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ না করলে ২) সাঈ না করলে সাফা–মারওয়া দৌড় বাদ গেলে ৩)  কুরবানী (হাদী) না দিলে তামাত্তু/কিরান হজে ওয়াজিব কুরবানী না করলে ৪)  চুল কাটা/ন্যাড়া না করলে حلق / تقصير না করলে ৫)  বিদায়ী তাওয়াফ না করলে হজ শেষে কাবা ত্যাগের আগে তাওয়াফ বাদ গেলে ৬) মিনা অবস্থান বাদ গেলে আইয়ামে তাশরীক রাতে না থাকলে (কারণভেদে)

হজে দম (Dam) –  শুধু ওয়াজিব বাদ গেলে দম লাগে।

যেসব ক্ষেত্রে দম লাগে (ওয়াজিব ছুটে গেলে) ১)  রমি (পাথর মারা) না করলে ২)  সাঈ না করলে ৩) হাদী/কুরবানী না দিলে ৪)  চুল না কাটলে (হালক/তাকসীর) ৫)  বিদায়ী তাওয়াফ না করলে ৬)  মিনায় থাকা বাদ দিলে (কারণ ছাড়া)

সহজ মনে রাখার লাইন “ফরজ = হজ ভাঙে, ওয়াজিব = দম লাগে, সুন্নত = শুধু সওয়াব কমে”

কুরআনে হজ সম্পর্কিত বিষয়গুলো মূলত ৫ ভাগে এসেছে: ১) ফরজ হওয়ার ঘোষণা → 3:97 ২) বিধান (ইহরাম, সাঈ, আরাফা, মিনায় কাজ) → 2:196–203 ৩) কাবা ও আহ্বান → 22:26–28 ৪) কুরবানী → 22:32–37 ৫) সময় ও সামাজিক ঘোষণা → 9:3

আরাফাতে অবস্থান (وُقُوفُ عَرَفَة) হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমনকি ইসলামী বিধান অনুযায়ী— আরাফাতে না গেলে হজই পূর্ণ হবে না।

আরাফা কি? মক্কার বাইরে একটি বিশাল সমতল ময়দান, যেখানে ৯ জিলহজ হাজিরা অবস্থান করেন। আরাফার অবস্থানের গুরুত্ব কেন? 1)  কুরআনের ইঙ্গিত সূরা বাকারা  আয়াত 2:198 “তোমাদের জন্য কোনো দোষ নেই যে তোমরা তোমাদের রবের অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো… তারপর আরাফা থেকে ফিরো এবং আল্লাহকে স্মরণ করো…” বিঃদ্রঃ  এখানে “আরাফা থেকে ফেরার” নির্দেশই প্রমাণ করে যে আরাফা হজের কেন্দ্রীয় অংশ। 2)  রাসূল ﷺ-এর ঘোষণা (মূল ভিত্তি)। রাসূল সাঃ বলেছেন:“হজ হলো আরাফা (অর্থাৎ আরাফায় অবস্থান করাই হজ)।” (অর্থ: মূল রুকন আরাফায় অবস্থান) অর্থাৎ কেউ যদি আরাফায় না দাঁড়ায়, তার হজ পূর্ণ হয় না। 3)  আরাফায় অবস্থানের সময় ও রুকনের সীমা। ৯ জিলহজ দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে — যেকোনো অবস্থায় দুআ-ইস্তিগফার করা যায়। কিন্তু সীমার বাইরে থাকলে রুকন বাতিল। 4)  হজের “চূড়ান্ত মুহূর্ত” কেন আরাফা? আরাফায় তিনটি বিষয় একসাথে হয়: তাওহিদের পূর্ণ প্রকাশ (লাব্বাইক) সর্বোচ্চ বিনয় ও আত্মসমর্পণ গুনাহ মাফের ঘোষণা (হাদীস অনুযায়ী) 5)  আধ্যাত্মিক কারণঃ আরাফার দিনকে বলা হয়:“ইসলামের সবচেয়ে বড় দোয়ার দিন” হাজিরা যেন কিয়ামতের মাঠে দাঁড়িয়ে আছে—এই অনুভূতি

হজ্জ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াত সমুহঃ ১) সূরা আল-বাকারা  আয়াত 2:158 সাফা-মারওয়া সাঈ (হজ/উমরার অংশ) “সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত…” ২) সুরা বাকারা  আয়াত 2:196 হজ ও উমরার বিধান। ইহরাম, মাথা মুণ্ডন, ফিদইয়া (দম/কুরবানী বিকল্প) ৩) সুরা বাকারা  আয়াত 2:197 হজের সময় নির্ধারণ, তকওয়া। “হজ নির্দিষ্ট মাসসমূহে…” ৩) সূরা বাকারা  আয়াত 2:198 আরাফা থেকে মুজদালিফা, যিকির।

৪) সূরা বাকারা  আয়াত 2:199 মিনা থেকে প্রত্যাবর্তন ৫) সূরা বাকারা  আয়াত 2:200–203 মিনায় তাশরীক দিন, যিকির, দোয়া ৬)  সূরা আলে ইমরান আয়াত 3:97 হজ ফরজ হওয়ার ঘোষণা। কাবা শরীফের মর্যাদা “যার সামর্থ্য আছে তার উপর হজ আল্লাহর জন্য ফরজ” ৭) সূরা আল-মায়িদা আয়াত 5:1 ইহরাম অবস্থার বিধিনিষেধ (চুক্তি পূর্ণ করা) ৮) সূরা আল-হজ (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ) আয়াত 22:26–29। কাবা নির্মাণ ও হজের আহ্বান। তাওয়াফ, কুরবানী, ইহরাম। ৯) সূরা হজ্জ আয়াত 22:27 হজের ঘোষণা (ইবরাহিম আঃ) ১০) সূরা হজ্জ  আয়াত 22:28 মানুষকে হজে আসার আহ্বান ১১) সূরা হজ্জ  আয়াত 22:29 তাওয়াফের নির্দেশ ১২) সূরা হজ্জ  আয়াত 22:32–37 কুরবানী, তাকওয়া, পশু জবাই ১৩) সূরা আত-তাওবা আয়াত 9:3 হজের সময় বড় ঘোষণা। মুশরিকদের জন্য সাধারণ ঘোষণা বন্ধ। ১৪) সূরা আল-ফাতহ আয়াত 48:27 রাসূল সাঃ-এর উমরার স্বপ্ন। নিরাপদে মসজিদুল হারামে প্রবেশ।

By Ekramul hoq

I am A.K.M Ekramul hoq MA.LLB. Rtd Bank Manager & PO of Agrani Bank Ltd. I am interested writing and reading. Lives in Bangladesh, District Jamalpur.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

``` }