পরিস্কার এবং পবিত্র কি?
হাত-পা ধুয়ে অযু করা কি কুরআনের দৃষ্টিতে “পবিত্রতা” (طهارة) ?
সাধারন ভাবে আমাদের ধারনা অযু – গোসল করে পবিত্রতা অর্জন করতে হয়। অযু -গোসল করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হওয়া যায়, পবিত্র নয়। হাত-পা ধুয়ে অযু করা কুরআনের দৃষ্টিতে পবিত্রতার একটি অংশ। এটি শরীরের পবিত্রতা।
কিন্তু কুরআন আরও বড় পবিত্রতার কথা বলে: আত্মা ও চরিত্রের পবিত্রতা।
কুরআনে “পবিত্রতা” বোঝাতে প্রধানত দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে: ১) طهارة (তাহারা) — ط هـ ر ২) تزكية (তাযকিয়া) — ز ك و
নাযাফা —- বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা (দৃশ্যমান ময়লা মুক্ত) কুরআনে পরিচ্ছন্নতার নির্দেশ সাধারণত طيّب শব্দ দিয়ে এসেছে।
তাহারাহ = পবিত্রতা (শারীরিক + আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতা)
সালাত বা ইবাদতের জন্য طهارة অপরিহার্য।
কুরআনে “পবিত্রতা” শব্দটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে নৈতিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে,। শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নয়।
যেমনঃ সূরা বাকারা আয়াত ১৫১
” আমি তোমাদের মধ্য হইতে তোমাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করিয়াছি, যে আমার আয়াতসমূহ তোমাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তোমাদেরকে পবিত্র করে এবং কিতাব ও হিক্মত শিক্ষা দেয় আর তোমরা যাহা জানিতে না তাহা শিক্ষা দেয়। (২:১৫১)
এখানে “পবিত্র করা” বলতে কি বোঝানো হয়েছে? এই আয়াতে “পবিত্র” শব্দটি শরীর ধোয়া বা গোসলের পবিত্রতা নয়। এটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক পরিশুদ্ধতা বোঝায়।
” আমার ঘরকে পবিত্র কর তাওয়াফকারীদের জন্য।” ২:১২৫
এ আয়াতেে কাবা ঘরকে ধুয়ে মুছে পবিত্র রাখতে বলেছেন? না কখনোই না বরং শিরক থেকে মুক্ত রাখাকে পবিত্র বুঝিয়েছেন।
“রাসূল তোমাদের পবিত্র করেন।” ২:১৫১
এ আয়াতে রাসুল তার অনুসারীদের অযু করিয়ে কি পবিত্র করবেন? না, কখনোই নহে। বরং নৈতিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে,।
আল্লাহ তোমাকে নির্বাচন করেছেন এবং পবিত্র করেছেন।(৩:৪২)
এ আয়াতে আল্লাহ কিভাবে রাসুলকে পবিত্র করেছেন বলে বুঝিয়েছেন? অযু করিয়ে? না, বরং আত্মিক পবিত্রতা। আত্মা পরিশুদ্ধ করা। বিশ্বাসের পবিত্রতা। শিরক থেকে মুক্ত করে।
যেমন সূরা ইমরানের ৫৫ নং আয়াতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেনঃ আমি তোমাকে অবিশ্বাসীদের থেকে পবিত্র/মুক্ত করব।(৩:৫৫)
“এটি স্পর্শ করে না পবিত্ররা ছাড়া।” ৫৬:৭৯
এ আয়াতে কোরান বুঝতে হলে নীতি- নৈতিকতা, শিরক মুক্ত হওয়ার শর্ত, এখানে পবিত্রতা বলতে অযু গোসলকে বুঝান নাই। অথচ আমরা জেনে এসেছি অযু না করে কোরান ধরা যাবে না।
সফল সে, যে পবিত্রতা অর্জন করেছে। ৮৭:১৪ এ আয়াতে কি অযু গোসল কারীকে আল্লাহ সফল বলেছেন? কখনোই না। বরং কোরানের দর্শন অনুযায়ী চলাকে পবিত্রতা বুঝিয়েছেন।
অনুরুপ ভাবে নীচের আয়াতগুলির দিকে তাকালে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় পবিত্রতা বলেতে অযু কিংবা গোসল করা বুঝায় না। অযু গোসলের মাধযমে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হওয়াকে تزكية (তাযকিয়া) বলা হয়েছে। طهارة (তাহারা) — নয়।
তুমি কি দেখনি যারা নিজেদের পবিত্র দাবি করে। ৪:৪৯
আল্লাহ চান তোমাদের পবিত্র করতে।;৫:৬
সদকা তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে। ৯:১০৩
আল্লাহ চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করে সম্পূর্ণ পবিত্র করতে। ৩৩:৩৩
এ আয়াতগুলি থেকে বুঝা যায় অযু করে মানুষ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়। আল্লাহ মানুষকে পবিত্র করেন তার নাফসের পরিশুদ্ধতার বিনীময়ে।
কুরআনে “পবিত্রতা” চার ধরনের— ১️) শারীরিক পবিত্রতা। যেমনঃ অযু, গোসল (৫:৬) ২️) আধ্যাত্মিক পবিত্রতা। আত্মা পরিশুদ্ধ করা। (৯১:৯) ৩️) বিশ্বাসের পবিত্রতা। শিরক থেকে মুক্ত হওয়া। ২:২৫ ৪️) সামাজিক পবিত্রতা। দান, ন্যায়, নৈতিকতা। (৯:১০৩)
১) কুরআনে অযুর নির্দেশ এসেছে। সূরা আল-মায়িদা 5:6 হে ঈমানদারগণ, যখন তোমরা সালাতের জন্য দাঁড়াও: মুখ ধুয়ে নাও, হাত কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও, মাথা মাসেহ কর, পা গিরা পর্যন্ত ধুয়ে নাও, এটাই অযুর প্রক্রিয়া।
২) একই আয়াতের শেষ অংশে আল্লাহ উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন। সূরা মায়িদা 5:6
“আল্লাহ তোমাদের উপর কষ্ট চাপাতে চান না, বরং তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান।”
এখানে ব্যবহৃত শব্দ: ليطهركم (লিযুতাহহিরাকুম) অর্থ: পবিত্র করা / পরিষ্কার করা।
৩) তবে কুরআনে পবিত্রতার দুটি স্তর আছে।
(১) বাহ্যিক পবিত্রতা: যেমন: অযু – গোসল – পরিষ্কার থাকা। উদাহরণ: সূরা মায়িদা 5:6 “এটি শরীরের পবিত্রতা।”
(২) অন্তরের পবিত্রতা: কুরআনে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সূরা আশ-শামস 91:9
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا সফল সেই ব্যক্তি। যে নিজের আত্মাকে পবিত্র করেছে।
৪) কুরআনের দৃষ্টিতে দুই ধরনের পবিত্রতা মিলেই পূর্ণতা হয়।শারীরিক ও আধ্যাত্মিক।
শাররীক হল অযু, গোসল। আর আধ্যাত্মিক হল — আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা, শিরক মুক্ত।
কুরআনে “رجس (নাপাক)” এবং “طهر (পবিত্র)” শব্দের পার্থক্য কী।এটি বুঝলে পবিত্রতা সম্পর্কে কুরআনের প্রকৃত ধারণা পুরো পরিষ্কার হয়ে যাবে।
